Logo

আইন ও বিচার

স্বামীর অনুমতি ছাড়া ভ্রূণ নষ্ট: আইন কী বলে?

Icon

সোহানা ইয়াসমিন

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:২৯

স্বামীর অনুমতি ছাড়া ভ্রূণ নষ্ট: আইন কী বলে?

পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতায় গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসব শুধু চিকিৎসাগত বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সর্বোপরি আইন। সাম্প্রতিক সময়ে নানা পারিবারিক বিরোধ, দাম্পত্য কলহ কিংবা সামাজিক চাপের প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসছে- স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রী ভ্রূণ নষ্ট করলে সেটি কি অপরাধ? হলে তার শাস্তি কী? এই প্রশ্নের উত্তর আবেগে নয়, আইন ও সংবিধানের আলোতেই খুঁজতে হবে।

অনুমতির প্রশ্ন: স্বামীর না স্ত্রীর? :

প্রথমেই একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। বাংলাদেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইনে ভ্রূণ নষ্ট করার ক্ষেত্রে “স্বামীর অনুমতি” কোনো আইনি শর্ত নয়। আইন মূলত গুরুত্ব দেয়।  গর্ভপাতটি আইনের অনুমোদিত ব্যতিক্রমের মধ্যে পড়ে কি না।

অতএব সামাজিকভাবে স্বামীর সম্মতির প্রশ্ন উঠলেও, আইনগতভাবে স্বামীর অনুমতি না থাকাই অপরাধের একমাত্র ভিত্তি নয়- এ কথা স্পষ্টভাবে বুঝে নেওয়া জরুরি।

দণ্ডবিধিতে ভ্রূণ নষ্ট: অপরাধের কাঠামো

বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এ ভ্রূণ নষ্ট (গর্ভপাত) সংক্রান্ত বিধানগুলো ধারা ৩১২ থেকে ৩১৬-এ বিস্তারিতভাবে বর্ণিত।

ধারা ৩১২: গর্ভপাতের মূল অপরাধ

কোনো নারী যদি নিজে অথবা অন্য কাউকে দিয়ে গর্ভপাত ঘটান, তবে তা অপরাধ-

যদি না সেই গর্ভপাতটি নারীর জীবন রক্ষার জন্য সৎ বিশ্বাসে করা হয়।

শাস্তি : সাধারণ ক্ষেত্রে: সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয়, যদি নারী ‘‘quick with child’’  (ভ্রূণের নড়াচড়া শুরু) হন: সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। এখানে লক্ষণীয়,আইনে স্বামীর সম্মতির কথা একবারও বলা হয়নি। সম্মতি ছাড়া গর্ভপাত: কার সম্মতি জরুরি?

আইনের দৃষ্টিতে দুটি ভিন্ন পরিস্থিতি রয়েছে- 

নারীর সম্মতিসহ গর্ভপাত তবুও এটি অপরাধ, যদি জীবন রক্ষার ব্যতিক্রম না থাকে।

নারীর সম্মতি ছাড়া গর্ভপাত এটি আরও গুরুতর অপরাধ (ধারা ৩১৩),

শাস্তি: যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। অর্থাৎ, আইন নারীর সম্মতিকে কেন্দ্রে রেখেছে, স্বামীর সম্মতিকে নয়।

তাহলে স্বামীর অনুমতি ছাড়া গর্ভপাত কি অপরাধ? এই প্রশ্নের উত্তর আইনগতভাবে সূ²। শুধু এই কারণে যে স্বামীর অনুমতি নেওয়া হয়নি- তা অপরাধ নয়; কিন্তু যদি গর্ভপাতটি নারীর জীবন রক্ষার জন্য না হয়, এবং আইনসম্মত চিকিৎসা ব্যতিক্রমের আওতায় না পড়ে তাহলে স্বামীর অনুমতি থাকলেও তা অপরাধ হবে। অর্থাৎ, অনুমতির প্রশ্ন নয়- আইনের ব্যতিক্রম পূরণ হয়েছে কি না, সেটিই মূল বিবেচ্য।

চিকিৎসক ও সহায়তাকারীর দায় : ভ্রূণ নষ্টের ক্ষেত্রে শুধু নারী নয়, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, দালাল বা সহায়তাকারীরও দায় রয়েছে। অবৈধভাবে গর্ভপাত করালে চিকিৎসকও ধারা ৩১২/৩১৩ অনুযায়ী দণ্ডিত হবেন; চিকিৎসায় অবহেলায় যদি নারীর মৃত্যু ঘটে, তবে ধারা ৩১৪ অনুযায়ী আরও কঠোর শাস্তি হতে পারে। এ কারণে অবৈধ গর্ভপাত কেবল পারিবারিক সমস্যা নয়- এটি গুরুতর ফৌজদারি ঝুঁকি।

আমাদের সমাজে গর্ভপাতকে ঘিরে ধর্মীয় ও সামাজিক সংবেদনশীলতা প্রবল। কিন্তু আইন এখানে একটি ভারসাম্য রক্ষা করতে চায়- একদিকে ভ্রূণের সুরক্ষা, অন্যদিকে নারীর জীবন ও নিরাপত্তা। এই ভারসাম্যের বাইরে গিয়ে গোপনে বা অবৈধভাবে ভ্রূণ নষ্ট করা সমাজ ও রাষ্ট্র-উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।

সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুল ধারণা হলো “স্বামী রাজি থাকলে গর্ভপাত করা যায়” বা “স্বামীর অনুমতি না নিলে স্ত্রী অপরাধী।” এই দুই ধারণাই আইনগতভাবে ভুল। আইন স্বামী–স্ত্রীর পারিবারিক সম্মতির চেয়ে জীবন ও বৈধতার প্রশ্নকে প্রাধান্য দেয়।

অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণের ক্ষেত্রে আইনসম্মত পরিবার পরিকল্পনা ও পরামর্শ গ্রহণ জরুরি; জীবনঝুঁকি থাকলে নিবন্ধিত চিকিৎসকের মাধ্যমে বৈধ চিকিৎসা নেওয়া উচিত; অবৈধ দালাল ও গোপন ক্লিনিক থেকে দূরে থাকতে হবে।

স্বামীর অনুমতি ছাড়া ভ্রূণ নষ্ট করা- এই প্রশ্নে আইন আবেগের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। আইন স্পষ্টভাবে বলে- জীবন রক্ষা ছাড়া ভ্রূণ নষ্ট করা অপরাধ। সেখানে স্বামীর সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, তা গৌণ। অতএব গর্ভপাত কোনো পারিবারিক সিদ্ধান্তমাত্র নয়; এটি একটি গুরুতর আইনগত বিষয়। ভুল সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন নারীর জীবন বিপন্ন করতে পারে, অন্যদিকে জড়িয়ে ফেলতে পারে দীর্ঘমেয়াদি ফৌজদারি মামলায়। এই বাস্তবতা বুঝে, সচেতনতা ও আইনের পথে চলাই একমাত্র নিরাপদ সমাধান। 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর