ভোটকেন্দ্রে ভোটার নিরাপত্তা : ব্যর্থ হলে দায় এড়াতে পারবে না রাষ্ট্র
মাসুম আহম্মেদ
প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৩৮
জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, এটি সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান। সেই নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে যদি একজন নাগরিক নিরাপত্তাহীন বোধ করেন, তাহলে প্রশ্ন উঠে রাষ্ট্র তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে কি না। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে আসা ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য কোনো রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয় নয়; এটি একটি স্পষ্ট আইনগত ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।
ভোটকেন্দ্রে সহিংসতা, ভয়ভীতি, হামলা বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে তার দায় কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধী বা দলীয় ক্যাডারদের ঘাড়ে চাপিয়ে সরকার দায়মুক্ত থাকতে পারে না। আইনের চোখে রাষ্ট্রই সর্বশেষ দায়িত্বশীল সত্তা।
সংবিধান কী বলছে : ভোটাধিকার মানেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা
বাংলাদেশের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদ গণতন্ত্র নিশ্চিত করার কথা বলে। ৩৭ অনুচ্ছেদ শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও অংশগ্রহণের অধিকার দেয়। ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করে ভোটাধিকার এই মৌলিক অধিকারগুলোর সমন্বিত রূপ। ভোট দিতে যাওয়ার পথে যদি নাগরিক আহত হন, প্রাণ হারান বা ভীত হন তাহলে তা কেবল আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়, সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল।
উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়ে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র শুধু অধিকার প্রদান করেই দায় শেষ করতে পারে না; অধিকার প্রয়োগের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
নির্বাচন কমিশনের আইনি দায়িত্ব কেবল তফসিল নয়, নিরাপত্তাও। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (জচঙ) এবং সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তার দায়িত্ব অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা, ভোটারদের ভয়মুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ দেওয়া, ভোটকেন্দ্রে সহিংসতা বা ভীতি থাকলে নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক কর্তব্যে ব্যর্থ হয়। কমিশন চাইলে কেন্দ্র বাতিল করতে পারে, পুনঃভোটের নির্দেশ দিতে পারে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সরাসরি নির্দেশ দিতে পারে। কিন্তু বাস্তবে যদি কমিশন নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকে, তবে সেই ব্যর্থতার অংশীদার হিসেবেই ইতিহাস তাকে মূল্যায়ন করবে।
ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা প্রশ্নে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সরকারের। কারণ পুলিশ, র্যাব, আনসার, বিজিবি- সবই নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে। নির্বাচনকালীন সময়েও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরকারের অধীনেই কাজ করে। দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ আইন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। নির্বাচন উপলক্ষে সরকার যদি পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না দেয়, আগাম গোয়েন্দা তথ্য উপেক্ষা করে, সহিংসতার আশঙ্কা জেনেও ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে তা নিছক প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, আইনগত অবহেলা (criminal negligence) হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
ভোটকেন্দ্রে সহিংসতা হলে এটি ফৌজদারি অপরাধ ও রাষ্ট্রের দায়। ভোটকেন্দ্রে সংঘটিত অপরাধগুলো সাধারণ অপরাধ নয়, এগুলো রাষ্ট্রদ্রোহী প্রবণতার প্রকাশ।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত
দণ্ডবিধি অনুযায়ী অবৈধ সমাবেশ, দাঙ্গা, মারাত্মক অস্ত্র ব্যবহার, হত্যাচেষ্টা বা হত্যা এসব অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো অপরাধ সংঘটনের আগেই প্রতিরোধ কোথায়?
আইন শুধু শাস্তির কথা বলে না, প্রতিরোধের দায়ও রাষ্ট্রের ওপর আরোপ করে।
অতীত অভিজ্ঞতা: দায় এড়ানোর সংস্কৃতি
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে দেখা গেছে- ভোটকেন্দ্রে সহিংসতায় প্রাণহানি ঘটেছে, ভোটাররা কেন্দ্রে যেতে ভয় পেয়েছেন, কেন্দ্র দখল ও জাল ভোটের অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিবারই সরকার বলেছে- “বিচ্ছিন্ন ঘটনা”। কিন্তু আইন বলে পুনরাবৃত্তি মানেই কাঠামোগত ব্যর্থতা। যদি আসন্ন নির্বাচনেও একই চিত্র দেখা যায়, তাহলে তা আর দুর্ঘটনা নয়, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রমাণ।
ভোটার নিরাপত্তা না থাকলে নির্বাচন বৈধ থাকে কি? এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রশ্ন।
উচ্চ আদালতের নজির অনুযায়ী, ভোটাররা যদি ভীতির কারণে ভোট দিতে না পারেন।
ভোটকেন্দ্রে অবাধ উপস্থিতি বাধাগ্রস্ত হয়। তাহলে সেই নির্বাচনের নৈতিক ও আইনগত বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। গণতন্ত্রের মূল শর্ত হলো স্বেচ্ছায়, ভয়মুক্তভাবে ভোট প্রদান। ভয় থাকলে নির্বাচন কেবল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।
সরকার কি দায়মুক্ত থাকতে পারে? আইনের ভাষায়- “না”।
রাষ্ট্র যদি ঝুঁকির পূর্বাভাস পায়, সহিংসতার আশঙ্কা জানে তবু কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে তা রাষ্ট্রের গাফিলতি (state negligence) হিসেবে বিবেচিত হয়।
বড় ধরনের ক্ষতি হলে রাজনৈতিক দায় তো থাকবেই। ভবিষ্যতে আইনগত দায়বদ্ধতার প্রশ্নও উঠতে পারে গণতন্ত্রে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
বিজ্ঞজনরা মনে করেন যা আইনের আলোকে যা এখনই করতে হবে ১. ভোটকেন্দ্রভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন, ২. পর্যাপ্ত ও নিরপেক্ষ নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন, ৩. গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আগাম গ্রেপ্তার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, ৪. নির্বাচন কমিশনের দৃশ্যমান ও সক্রিয় ভূমিকা এবং ৫. ভোটারদের জন্য আস্থা ও সাহস সৃষ্টির বার্তা।
নিরাপত্তাহীন ভোট মানেই গণতন্ত্রের পরাজয়
ভোটার যদি নিরাপদ না হন, তবে নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না। নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে সরকারও নৈতিক শক্তি হারায়। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের আইনগত বাধ্যবাধকতা।
এতে ব্যর্থ হলে বড় ধরনের ক্ষতি শুধু রাজনৈতিক নয, তা হবে গণতন্ত্রের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। আর সেই দায় ইতিহাসে সরকারকেই বহন করতে হবে।
আইন সেই দায় স্পষ্ট করেই রেখেছে। এখন প্রশ্ন- রাষ্ট্র কি তার দায়িত্ব পালন করবে, নাকি আবারও ব্যর্থতার দায় ইতিহাসের ঘাড়ে চাপাবে?
বিকেপি/এমবি

