বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ- এই বাক্যটি আমরা গর্ব করে বলি, কিন্তু বাস্তবে নদী ব্যবস্থাপনায় আমাদের ব্যর্থতার ইতিহাসও দীর্ঘ। প্রতি বছর নদীভাঙনে সর্বস্ব হারান লাখো মানুষ, শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে কৃষি বিপর্যস্ত হয়, আবার বর্ষায় অতিরিক্ত পানিতে প্লাবিত হয় জনপদ। এই চিরাচরিত সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে যে কয়েকটি কৌশলগত প্রকল্পের কথা বারবার উঠে এসেছে, তার মধ্যে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প অন্যতম। অথচ বহু সমীক্ষা, আলোচনা ও প্রতিশ্রুতির পরও প্রকল্পটি আজও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। সমস্যা প্রকল্পে, নাকি সমস্যার মূলে রাজনীতি ও সিদ্ধান্তহীনতা?
পদ্মা ব্যারেজের ধারণা নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই নদীশাসন ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এই প্রকল্পের কথা আলোচিত। বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশক থেকে একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় পদ্মা নদীতে একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যারেজ নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণ সম্ভব হবে। প্রায় ১৫-২০ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারিত হতে পারে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা হ্রাস পাবে। নদীভাঙন ও আকস্মিক বন্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে। ভবিষ্যতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। এত সম্ভাবনার পরও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে কেন অগ্রসর হলো না- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এ লেখা।
আসলে, সমস্যাটি প্রকৌশলে নয়, সিদ্ধান্তে
এটি সত্য, পদ্মা একটি জটিল নদী। বিশ্বের অন্যতম পলি বহনকারী নদী হিসেবে এর স্রোত ও গতিপথ নিয়ন্ত্রণ কঠিন। চীন, নেদারল্যান্ডস, মিসর, ভিয়েতনাম- সব দেশই এর চেয়ে জটিল নদীতে ব্যারেজ ও রেগুলেটর নির্মাণ করেছে। পদ্মার পলি ও প্রবাহ নিয়ে ডাচ ও জাপানি বিশেষজ্ঞদের একাধিক সমীক্ষা ইতিবাচক সম্ভাবনার কথাই বলেছে অর্থাৎ, প্রকৌশলগত ঝুঁকি আছে কিন্তু তা অজেয় নয়। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায় রাজনৈতিক সাহসের ঘাটতি কোথায়?
দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প মানেই ঝুঁকি। কারণ সুফল আসে ধীরে, ব্যয় বড়, সমালোচনা তীব্র, কৃতিত্ব ভাগাভাগির সম্ভাবনা অনিশ্চিত, ফলে পদ্মা ব্যারেজের মতো প্রকল্প, রাজনৈতিকভাবে “নিরাপদ” নয়। এক সরকারের সময় আলোচনা শুরু হয়, পরের সরকার এসে নতুন করে সমীক্ষার নির্দেশ দেয়। এভাবে সময় পার হয়, কিন্তু সিদ্ধান্ত হয় না।
উন্নয়নের নামে আমরা সড়ক, সেতু, ফ্লাইওভার করেছি; কিন্তু নদীশাসনের মতো মৌলিক ও কৌশলগত প্রকল্পে রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি।
পদ্মা ব্যারেজ প্রসঙ্গে ভারত-সম্পর্ক একটি বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা। উজানে ফারাক্কা ব্যারাজের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক ভীতি তৈরি করেছে। তাহলে উজানে পানির প্রবাহ কমে গেলে ব্যারেজ কতটা কার্যকর হবে?
ভবিষ্যতে পানিবণ্টন নিয়ে নতুন কূটনৈতিক চাপ আসবে কি না? কিন্তু বাস্তবতা হলো ব্যারেজ না থাকলেও পানির সংকট আছে। কূটনীতি দুর্বল হলে প্রকল্প থাক বা না থাক- বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবেই অর্থাৎ, প্রকল্প না করাও কোনো নিরাপদ সমাধান নয়।
পরিবেশগত উদ্বেগ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো পরিবেশ রক্ষার নামে কি আমরা কার্যত কিছুই করব না? পরিকল্পিত ও আধুনিক ব্যারেজ পরিবেশবান্ধব হতে পারে। ফিশ পাস, সেডিমেন্ট ম্যানেজমেন্ট, নিয়ন্ত্রিত প্রবাহের মাধ্যমে ক্ষতি কমানো সম্ভব। বিশ্বের বহু দেশে তা করা হয়েছে। বাংলাদেশে সমস্যা হলো পরিবেশকে কখনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না, আবার কখনো সেটিকে অজুহাত বানিয়ে সিদ্ধান্ত এড়ানো হয়।
অর্থায়ন নিয়ে দ্বিধা: ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে ভাবতে হবে।
পদ্মা ব্যারেজের ব্যয় নিঃসন্দেহে বড়। কিন্তু প্রশ্ন হলো নদীভাঙনে প্রতি বছর যে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়, তার হিসাব কি নেওয়া হয়? কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার অর্থনৈতিক ক্ষতি কি বিবেচনায় আসে? বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা ব্যারেজ একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, যার আর্থসামাজিক সুফল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভোগ করবে। দেশে বড় প্রকল্পের আরেকটি বড় সমস্যা হলো একাধিক সংস্থার দ্ব›দ্ব, দায়িত্বের অস্পষ্টতা, সিদ্ধান্তে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পও এর ব্যতিক্রম নয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড এক কথা বলে, পরিবেশ অধিদপ্তর আরেক কথা, পরিকল্পনা কমিশন তৃতীয় কথা। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকে। যে প্রকল্পে লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা জড়িত, সেখানে জনগণের অংশগ্রহণ আশ্চর্যজনকভাবে সীমিত। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন পরিকল্পনা অস্পষ্ট।
জনআলোচনা নেই, আস্থার সংকট রয়ে গেছে। এটি রাজনৈতিক ব্যর্থতারই আরেকটি দিক।
তাহলে করণীয় কী? রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া বিকল্প নেই। পদ্মা ব্যারেজকে জাতীয় কৌশলগত প্রকল্প ঘোষণা, সংসদীয় পর্যায়ে দলমত নির্বিশেষে ঐকমত্য, আন্তর্জাতিক মানের হালনাগাদ কারিগরি ও পরিবেশগত সমীক্ষা, কূটনৈতিকভাবে পানিবণ্টন প্রশ্নে দৃঢ় ও বাস্তববাদী অবস্থান ও জনগণের অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ।
সিদ্ধান্তহীনতার খরচই সবচেয়ে বেশি। পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন না করার খরচ আমরা ইতোমধ্যেই দিচ্ছি- নদীভাঙনে, পানিসংকটে, কৃষি ক্ষতিতে, জলবায়ু ঝুঁকিতে। তাহলেএই মূল্য আমরা আর কতদিন দেব?
উন্নয়নের সাহস শুধু সেতুতে নয়, নদীশাসনের মতো কঠিন সিদ্ধান্তে দেখাতে হয়। পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের সমস্যা মূলত নদীতে নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতায়। এখনই যদি আমরা দায়িত্ব না নিই, ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।
বিকেপি/এমবি

