যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ-২০২৬ : নারী ও শিশু রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক
সোহানা ইয়াসমিন
প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৫৪
নারী ও শিশুর নিরাপত্তা কোনো বিলাসী সামাজিক এজেন্ডা নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব, মানবাধিকারের মৌলিক শর্ত এবং টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য পূর্বশর্ত। অথচ বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক পরিসরে দীর্ঘদিন ধরেই যৌন হয়রানি ও সহিংসতা একটি নীরব কিন্তু গভীর সামাজিক সংকট হিসেবে বিদ্যমান। আইনি অস্পষ্টতা, অভিযোগ জানাতে সামাজিক ভয়, ভুক্তভোগীকেই দোষারোপের মানসিকতা এবং প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনীহার কারণে বহু নারী ও শিশু ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
এই বাস্তবতায় কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ- ২০২৬ এবং পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশ- ২০২৬-এর নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অগ্রগতি। বিশেষত যৌন হয়রানির সংজ্ঞায় ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত হেনস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করা এই অধ্যাদেশকে সময়োপযোগী ও বাস্তবতার সঙ্গে সংগত করেছে। গত বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর বিকেলে বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এ তথ্য জানান।
তিনি জানান, বৈঠকে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশের খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ অধ্যাদেশ-২০২৬-এর খসড়া চূড়ান্ত এবং বাংলাদেশ প্রাণী ও প্রাণীজাত পণ্য সংঘনিরোধ অধ্যাদেশ-২০২৬-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে বৈঠকে জাতিসংঘের নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তিবিরোধী কনভেনশনের ৭০(১) ধারার আওতায় বাংলাদেশ কর্তৃক পূর্বে দেওয়া ঘোষণা প্রত্যাহারের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। পাশাপাশি ক্যারিবিয় দেশ গায়ানায় বাংলাদেশের একটি নতুন কূটনৈতিক মিশন খোলা, ২০২৫-২৮ সময়কালের আমদানি নীতি আদেশ অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক শিশু অপহরণ সংক্রান্ত হেগ কনভেনশন-১৯৮০-এ বাংলাদেশের পক্ষভুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এসব সিদ্ধান্ত নারী সুরক্ষা, মানবাধিকার, ক্রীড়া উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বাণিজ্যিক কাঠামো সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কেন এই অধ্যাদেশগুলো জরুরি ছিল
এতদিন যৌন হয়রানি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে মূলত নির্ভর করতে হয়েছে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা, দণ্ডবিধির বিচ্ছিন্ন কিছু ধারা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নীতিমালার ওপর। এসব ব্যবস্থায় ছিল আইনি স্পষ্টতার অভাব এবং বাস্তবায়নে বাধ্যতামূলক শক্তির ঘাটতি। বিশেষ করে ডিজিটাল হয়রানি মোকাবিলায় কার্যকর ও সুসংহত আইনি কাঠামো অনুপস্থিত ছিল। অন্যদিকে পারিবারিক সহিংসতার ক্ষেত্রে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন থাকা সত্ত্বেও মানসিক নির্যাতন, অর্থনৈতিক নিপীড়ন ও নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ বহু ক্ষেত্রে আইনের আওতার বাইরে থেকে গেছে।
যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ-২০২৬ : কী নতুন যোগ হলো
এই অধ্যাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যৌন হয়রানির সংজ্ঞাকে বিস্তৃত করা। এতে শারীরিক আচরণের পাশাপাশি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে অশালীন মন্তব্য ও ইঙ্গিত, অনাকাক্সিক্ষত স্পর্শ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্টকিং, অবাঞ্ছিত বার্তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-মেইল ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সংঘটিত ডিজিটাল হেনস্থা। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে—অনলাইন জগৎ কোনো আইনি শূন্য এলাকা নয়।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত ও প্রতিকার প্রক্রিয়া নির্ধারণ, ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন আর নৈতিক আহ্বান নয়; এটি আইনি বাধ্যবাধকতা।
পারিবারিক সহিংসতা : ব্যক্তিগত বিষয় নয়
পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশের অন্যতম শক্তি হলো সহিংসতার সংজ্ঞাকে কেবল শারীরিক আঘাতে সীমাবদ্ধ না রাখা। এতে মানসিক নির্যাতন, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, চলাফেরা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা এবং শিশুর মানসিক ক্ষতির স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে পরিবারকে আর ‘আইনের বাইরে ব্যক্তিগত এলাকা’ হিসেবে দেখার সুযোগ রাখা হয়নি। রাষ্ট্র নীতিগতভাবে স্বীকার করেছে-পারিবারিক সহিংসতা একটি সামাজিক ও মানবাধিকার সমস্যা এবং এতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ন্যায়সঙ্গত ও প্রয়োজনীয়।
তবে বাস্তব চ্যালেঞ্জও কম নয়। আইন প্রণয়ন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ এর কার্যকর বাস্তবায়ন। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ মানেই ‘সম্মানহানি’—এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ ও ফরেনসিক সক্ষমতার ঘাটতি এবং ভুক্তভোগী-সুরক্ষামূলক মনোভাবের অভাব আইন প্রয়োগে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আইন হলো শুরু, শেষ নয়। যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ-২০২৬ এবং পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশ-২০২৬ যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্র কেবল জ্ঞান ও উৎপাদনের স্থান নয়-নিরাপদ ও মানবিক পরিসরে রূপ নেবে। আর সেটিই হোক রাষ্ট্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
বিকেপি/এমবি

