Logo

আইন ও বিচার

ন্যায়বিচারের দুয়ারে প্রতারণা : ঢাকার আদালতপাড়ায় টাউট-বাটপারের দৌরাত্ম্য

Icon

আইন ও আদালত ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫৫

ন্যায়বিচারের দুয়ারে প্রতারণা : ঢাকার আদালতপাড়ায় টাউট-বাটপারের দৌরাত্ম্য

ন্যায়বিচারের দুয়ারে প্রতারণা : ঢাকার আদালতপাড়ায় টাউট-বাটপারের দৌরাত্ম্য। ছবি : বাংলাদেশের খবর

ঢাকার আদালতপাড়া। স্থানটি হওয়ার কথা ন্যায়বিচার প্রত্যাশী মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল, সেখানে আজ ক্রমেই গড়ে উঠছে টাউট ও বাটপারদের এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী সাম্রাজ্য। আইনজীবী নন, বার কাউন্সিলের কোনো সনদ নেই, তবু কালো কোট, সাদা শার্ট, গলায় টাই ঝুলিয়ে দিব্যি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এক বিল্ডিং থেকে আরেক বিল্ডিং। সহজ-সরল বিচারপ্রার্থীদের চোখে তারা যেন ‘আইনের মানুষ’। বাস্তবে তারা সংঘবদ্ধ প্রতারক-যারা আদালতের পবিত্র পরিবেশকেই কলুষিত করছে।

ঢাকার জেলা ও মহানগর আদালত এলাকায় গেলে প্রায়শই চোখে পড়ে- একদল লোক আদালতের বারান্দা, করিডর, নোটারি পাবলিকের সামনে কিংবা কোর্টের ফটকে ঘোরাঘুরি করছে। তারা নিজেদের পরিচয় দেয় “অমুক সিনিয়রের সহকারী”, “কোর্টের লোক”, “মামলা ম্যানেজ করে দেওয়ার মানুষ” হিসেবে। বাস্তবে এদের অনেকেরই বার কাউন্সিল সনদ নেই, এমনকি তারা কোনো আইনজীবীর নিয়মিত সহকারীও নন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এদের অনেকেই অবাধে প্রবেশ করছে গোপন রেকর্ড রুমে, যেখানে মামলার নথি, চার্জশিট, আদেশপত্র সংরক্ষিত থাকে। এই প্রবেশাধিকার তারা পেল কীভাবে? কার ছত্রচ্ছায়ায় এই অনিয়ম দিনের পর দিন চলতে পারছে?

সূত্রে জানা যায়, ইতিপূর্বে ঢাকা বারের পক্ষ থেকে বিশেষ অভিযান চালিয়ে কয়েকজন টাউট ও বাটপারকে হাতেনাতে ধরা হয়েছে। এসব অভিযানে প্রমাণ হয়েছে, আদালত এলাকায় টাউট চক্র সক্রিয় ও সংগঠিত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হলো এই অভিযানগুলো খণ্ডিত ও সাময়িক। অভিযানের পর কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তারা আবার নতুন রূপে ফিরে আসে। কারণ, এই চক্রের শেকড় অনেক গভীরে। শুধু কয়েকজন টাউট ধরলেই সমস্যার সমাধান হয় না, যদি পেছনের মদদদাতা ও সুযোগ করে দেওয়া ব্যবস্থাটি অক্ষত থাকে।

যে মানুষটি আদালতে আসে, সে সাধারণত বিপদগ্রস্ত। জমি হারিয়েছে, মারামারি মামলায় জড়িয়েছে, পারিবারিক বিরোধে পড়েছে কিংবা ফৌজদারি মামলার ভয়ে দিশেহারা। আইনের ভাষা সে বোঝে না, আদালতের প্রক্রিয়া তার কাছে দুর্বোধ্য। ঠিক এই দুর্বলতার সুযোগ নেয় টাউট বাটপাররা। তারা খুব কৌশলে কথা বলে- “মামলাটা জটিল, কিন্তু আমি থাকলে চিন্তা নাই।” “উকিল ধরার দরকার নাই, আমি সব ম্যানেজ করে দেব।” “এই কোর্টে আমার খুব চলাফেরা।”

অনেক সময় বিচারপ্রার্থী শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে, ধারদেনা করে টাউটদের হাতে টাকা তুলে দেন। ফলাফল, মামলা যেমন এগোয় না, তেমনি টাকা ফেরত পাওয়ারও কোনো উপায় থাকে না।

সিনিয়র আইনজীবীদের নাম ভাঙানো : বিশ্বাসঘাতকতার আরেক রূপ 

এই টাউট বাটপারদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সিনিয়র আইনজীবীদের নাম ভাঙানো। তারা ভুয়া পরিচয়ে বলে বেড়ায়- “আমি অমুক সাহেবের লোক।” “এই মামলাটা ওই সিনিয়রই দেখছেন, আমি তার প্রতিনিধি।”

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট সিনিয়র আইনজীবী বিষয়টি জানেনই না। অথচ তার নাম ব্যবহার করে দিনের পর দিন প্রতারণা চলছে। এতে শুধু বিচারপ্রার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হন না; আইনজীবী সমাজের সম্মান ও বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষুণ্ন হয়।

আদালতপাড়ার টাউটদের হাতে এখন আর কেবল মুখের কথা নেই। তাদের আছে রঙিন ভিজিটিং কার্ড। এসব কার্ডে থাকে ভুয়া নাম, ভুয়া চেম্বার ঠিকানা, ভুয়া পদবি, একাধিক মোবাইল নম্বর। দেখতে এতটাই পেশাদার যে একজন সাধারণ মানুষ সহজেই বিশ্বাস করে বসে। অনেক সময় ভিজিটিং কার্ডে এমন সব চেম্বারের ঠিকানা দেওয়া থাকে, যা বাস্তবে আদৌ অস্তিত্বহীন।

আদালতপাড়ায় টাউট বাটপারদের এই দৌরাত্ম্য কেবল ব্যক্তিগত প্রতারণা নয়, এটি আইনের শাসনের ওপর সরাসরি আঘাত। বিচারপ্রার্থীর মনে যখন এই ধারণা জন্মায় যে, “আইন নয়, লোক ধরতে পারলেই কাজ হবে”, তখন ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ভেঙে পড়ে।

একটি রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা নষ্ট হওয়া মানে রাষ্ট্রের ভিত নড়বড়ে হয়ে যাওয়া।

প্রশাসনের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

এই সমস্যার জন্য শুধু টাউটদের দোষ দিলে হবে না। প্রশ্ন উঠবেই  আদালত এলাকায় তারা এত অবাধে ঘোরে কীভাবে? গোপন রেকর্ড রুমে ঢোকার অনুমতি কারা দেয়? কারা চোখ বন্ধ করে রাখে? যেখানে আইনজীবীদের বার কাউন্সিল সনদ ছাড়া আদালতে প্র্যাকটিস নিষিদ্ধ, সেখানে সনদহীন লোকেরা আইনজীবীর পোশাক পরে ঘুরে বেড়াবে- এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী কে এম খায়রুল কবীর বাংলাদেশের খবরকে বলেন, এখনই কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কিছু জরুরি পদক্ষেপ এখনই নেওয়া দরকার।

তিনি বলেন, প্রথমত, আদালত এলাকায় সনদ যাচাই ব্যবস্থা চালু করতে হবে। নিয়মিত মনিটরিং ও পরিচয়পত্র প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইনজীবীর পোশাক ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। সনদহীন কেউ কালো কোট পরলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। তৃতীয়ত, গোপন রেকর্ড রুমে প্রবেশের ক্ষেত্রে ডিজিটাল লগ ও অনুমতিপত্র চালু করতে হবে। চতুর্থত, টাউট ও বাটপারদের বিরুদ্ধে শুধু উচ্ছেদ নয়, ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে, যাতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়। পঞ্চমত, বিচারপ্রার্থীদের জন্য আদালত চত্বরে আইনগত সহায়তা ও তথ্য ডেস্ক চালু করতে হবে, যাতে তারা টাউটের খপ্পরে না পড়েন।

ঢাকার আদালতপাড়া যদি টাউট বাটপারদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়, তবে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা নিঃশেষ হয়ে যাবে। আদালতের দরজায় দাঁড়িয়েই যদি মানুষ সর্বস্ব হারায়, তবে সেই বিচারব্যবস্থা সভ্য সমাজের মানদণ্ডে টিকে থাকতে পারে না। অতএব, এখনই সময় আইনজীবী সমাজ, বার এসোসিয়েশন, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগে আদালতপাড়াকে টাউটমুক্ত করা। ন্যায়বিচারের মন্দিরে প্রতারণার কোনো স্থান থাকতে পারে না। নইলে একদিন বিচারপ্রার্থীর বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে বিচারব্যবস্থার মর্যাদাও ধসে পড়বে। 

বিকেপি/এমবি

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর