Logo

আইন ও বিচার

একই অপরাধ, ভিন্ন সাজা: বাংলাদেশের সেন্টেন্সিং ব্যবস্থার বৈষম্য

Icon

অ্যাডভোকেট মাসুদুর রহমান বাংলা

প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:১৬

একই অপরাধ, ভিন্ন সাজা: বাংলাদেশের সেন্টেন্সিং ব্যবস্থার বৈষম্য

দেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে অদৃশ্য অথচ সবচেয়ে মারাত্মক সমস্যাগুলোর একটি হলো সেন্টেন্সিং গাইডলাইনের অনুপস্থিতি। অপরাধ প্রমাণিত হলে কীভাবে শাস্তি নির্ধারণ করা হবে, কোন অপরাধে কী পরিমাণ শাস্তি যুক্তিযুক্ত, কোন পরিস্থিতিকে mitigating বা aggravating হিসেবে বিবেচনা করা হবে, শাস্তির লক্ষ্য হবে প্রতিশোধ, প্রতিরোধ, সংশোধন নাকি পুনর্বাসন, এসব বিষয়ে দেশে কোনো সুস্পষ্ট, রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত নির্দেশনা নেই।

Penal Code  ১৮৬০ অনেক বিধানে “ up to” বা “not exceeding” শব্দ ব্যবহার করে সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করলেও বেশির ভাগ ধারায় সর্বনিম্ন শাস্তি নির্ধারণ না করায় বিচারকের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন ও স্বাধীনতা অপরিমেয় হয়ে উঠেছে। এর ফলে একই অপরাধে দুই ভিন্ন আদালত সম্পূর্ণ ভিন্ন সাজা প্রদান করে, যা আইনের সমতার নীতি এবং ন্যায়বিচারের পূর্বানুমানযোগ্যতার ধারণাকে দুর্বল করে। বিচারব্যবস্থার প্রতি জনআস্থার হ্রাস, অপরাধীর প্রতি অপ্রয়োজনীয় কঠোরতা বা অযৌক্তিক কোমলতা এবং ভুক্তভোগীর ক্ষোভ, সব মিলিয়ে বাংলাদেশের sentencing system একটি অগোছালো, অপ্রাতিষ্ঠানিক, বৈষম্যমূলক কাঠামোতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে sentencing disparities  এর বহু বাস্তব উদাহরণ রয়েছে। যেমন- একই ধরনের চুরি মামলায় কোথাও ছয় মাস, কোথাও তিন বছর কারাদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। একই ধরনের মারধরের মামলায় কোনো আদালত জরিমানা দিয়ে মুক্তি দিচ্ছেন, আবার অন্য আদালত একই অপরাধে এক বছরের শাস্তি দিচ্ছেন। এ বৈষম্যের প্রধান কারণ Penal Code-এর অস্পষ্ট কাঠামো, যেখানে মাত্র সর্বোচ্চ শাস্তি আছে; কোনো নির্দেশিত starting point  নেই, নেই proportionality-এর কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড। বিচারকের অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ, ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি, workload, প্রমাণ উপস্থাপনার গুণগত পার্থক্য, এসব কারণে sentencing outcome একেক আদালতে একেকরকম হয়।

উপরন্তু বাংলাদেশে plea bargaining  নেই, নেই victim impact statement, নেই offender assessment report, ফলে sentencing অনেক সময় মামলার বাস্তব জটিলতা ও মানুষের মানসিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটকে প্রতিফলিত করতে ব্যর্থ হয়। একই অপরাধে ভিন্ন সাজা শুধু বিচারবৈষম্যই নয়, এটি বিচারব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক অপরাধবিশ্লেষণ ক্ষমতার ঘাটতিরও প্রমাণ।

Sentencing inconsistency-এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো কাঠামোগত দুর্বলতা। Penal Code ১৮৬০ তখনকার উপনিবেশিক মানসিকতা নিয়ে তৈরি হয়েছিল, যেখানে অপরাধ এবং শাস্তির ধারণা ছিল অত্যন্ত সীমিত, behavioral science বা criminology-ভিত্তিক নয়। বাংলাদেশের আইন এখনও সেই পুরনো কাঠামোই বহন করছে।

অপরাধের প্রকৃতি, অপরাধীর ইতিহাস, মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, অপরাধের ফলাফল-এসব বিষয় sentencing-এ কীভাবে বিবেচিত হবে তার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। এছাড়া Probation of Offenders Ordinance, ১৯৬০ থাকলেও তার প্রয়োগ অত্যন্ত সীমিত, probation officer-এর অভাব প্রকট। সেজন্য পুনর্বাসনমূলক শাস্তির পরিবর্তে কারাদণ্ডই সবচেয়ে সহজ ও প্রচলিত উপায় হয়ে উঠেছে।

অপরদিকে, Conviction এবং Sentencing-এর মধ্যে পৃথক hearing-এর বাধ্যবাধকতা না থাকা, আপিল আদালতের inconsistent approach, বিচারকদেরworkload, এসব মিলিয়ে sentencing অংশকে প্রায়শই রায়ের একটি আনুষ্ঠানিক, সংক্ষিপ্ত, উপেক্ষিত উপাদানে পরিণত করেছে। কাঠামোগত ব্যর্থতা না দূর করলে আরও একশো বিচারক যোগ করলে ও sentencing-এর বৈষম্য দূর হবে না।

Sentencing discretion-এর পক্ষে যুক্তি আছে, প্রতিটি মামলার পরিস্থিতি আলাদা, তাই rigid guideline  থাকলে ন্যায়বিচার অনমনীয় হয়ে যাবে। বিচারককে মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় discretion একটি বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি করেছে। Structured discretion  না হয়ে discretion এখন arbitrary হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিই প্রধান নিয়ামক। আইনজীবীর দক্ষতা, প্রমাণের উপস্থাপনা, বিচারকের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতা, এসব factor sentencing outcome-কে প্রভাবিত করছে, যা হওয়া উচিত নয়।

একটি অপরাধের শাস্তি কত হবে তা বিচারিক বিজ্ঞান, সামাজিক ক্ষতির মাত্রা, অপরাধীর দায়িত্ববোধ এবং সমাজের প্রতিরোধ-চাহিদার ওপর নির্ভর করার কথা ছিল; কিন্তু তা অনেক সময় বিচারকের ব্যক্তিগত কঠোরতা বা কোমলতার দ্বারা নির্ধারিত হয়। এর ফলে মানুষের মনে জন্ম নেয়, একই অপরাধ ভিন্ন আদালতে ভিন্ন ফলাফল কেন? আইন কি সকলের জন্য একই নয়? এ ধরনের প্রশ্ন বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

বিশ্বের উন্নত ও মধ্যম আয়ের অনেক দেশেই sentencing guidelines-এর বিস্তৃত ব্যবহার রয়েছে। যুক্তরাজ্যের Sentencing Council প্রতিটি অপরাধের জন্য starting point, harm level, culpability, aggravatingymitigating factor, সবকিছু নির্ধারিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে federal sentencing grid আছে, যেখানে offence level  ও criminal history score  অনুযায়ী সাজা নির্ধারণ হয়। অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, কানাডার মতো দেশে অত্যন্ত সুগঠিত sentencing framework  বিদ্যমান। এমনকি ভারতের সর্বোচ্চ আদালত বহু রায়ে structured sentencing-এর কথা বলেছে, এবং কমিটিও করা হয়েছে। শ্রীলংকা ও নেপাল নতুন penal code  গ্রহণ করে sentencing structure  স্পষ্ট করেছে।

বাংলাদেশে sentencing guideline  চালু করা এখন শুধু আইনি প্রয়োজন নয়, এটি বিচারব্যবস্থার নৈতিক দায়িত্ব। প্রথমত, একটি National Sentencing Guidelines Board গঠন করতে হবে, যেখানে বিচারপতি, আইনবিদ, অপরাধবিজ্ঞানী এবং মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা থাকবে। তাদের কাজ হবে অপরাধভেদে guideline তৈরি করা, starting point, sentencing range, mitigatingyaggravating circumstances  এবং offender assessment পদ্ধতি নির্ধারণ করা। তৃতীয়ত, probation ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে, modern rehabilitation concept  আদালতে সম্প্রসারণ করতে হবে। চতুর্থত,victim impact statement  প্রবর্তন করতে হবে, যাতে ভুক্তভোগীর ক্ষতির মাত্রা রায়ে প্রতিফলিত হয়। পঞ্চমত, বিচারকদের নিয়মিত sentencing প্রশিক্ষণ প্রদান জরুরি।

সর্বোপরি, আপিল আদালতকেও uniform standards  গ্রহণ করতে হবে। এইসব সংস্কার না হলে Bangladesh-Gi sentencing structure -এর অপরিবর্তিত বৈষম্য, অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেই আটকে থাকবে। ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি হলো- same offence, similar punishment; আর তা নিশ্চিত করতে structured sentencing  অপরিহার্য।

পরিশেষে বলতে পারি যে, বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় sentencing guideline-এর অনুপস্থিতি কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা নয়,এটি ন্যায়বিচারের মৌলিক দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এক গভীর কাঠামোগত ব্যর্থতা। একই অপরাধে ভিন্ন ভিন্ন শাস্তি প্রদান আইনসমতার নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, বিচারিক নিরপেক্ষতার ওপর আঘাত হানে এবং নাগরিকদের মনে ন্যায়বিচার সম্পর্কে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। যদি বিচারব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা পুনরুদ্ধার করতে হয়, ভুক্তভোগীর ন্যায্য প্রত্যাশাকে সম্মান জানাতে হয় এবং অপরাধ দমনে কার্যকর ও ন্যায়সংগত শাস্তি নিশ্চিত করতে হয়, তবে sentencing reform  আর বিলাসিতা নয়, এটি একটি অবশ্যম্ভাবী প্রয়োজন। ন্যায়বিচারের প্রকৃত মানে কেবল দোষী সাব্যস্ত করা নয়; বরং যুক্তিসংগত, সামঞ্জস্যপূর্ণ ও মানবিক শাস্তির মাধ্যমে আইনকে সকলের জন্য সমানভাবে কার্যকর করা। structured sentencing  সেই লক্ষ্য অর্জনেরই অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

লেখক : মাসুদুর রহমান ; অ্যাডভোকেট , বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

বিকেপি/ এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর