নেই অভিযান ও আইনের প্রয়োগ
মোবাইল বাজারে অবৈধ হ্যান্ডসেটের রমরমা বাণিজ্য
মাসুম আহম্মেদ
প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:৩৭
রাজধানী ঢাকা দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। অথচ এই আধুনিক শহরের মোবাইল ফোন বাজারে দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে এক ভয়ংকর অনিয়ম- অবৈধ ও নকল হ্যান্ডসেটের অবাধ বাণিজ্য। গুলিস্তান, এলিফ্যান্ট রোড, বসুন্ধরা সিটি, মিরপুর, উত্তরা থেকে শুরু করে অলিগলির ছোট দোকান- সবখানেই এখন একই চিত্র। নামিদামি ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোন কিনতে গিয়ে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ গ্রাহকরা। অথচ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর অভিযান চোখে পড়ছে না বললেই চলে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমানে রাজধানীর মোবাইল বাজারে যে অবৈধ হ্যান্ডসেটগুলো বিক্রি হচ্ছে, সেগুলোর বেশিরভাগই তিন ধরনের- ক্লোন বা নকল হ্যান্ডসেট যা বাহ্যিকভাবে নামিদামি ব্র্যান্ডের মতো হলেও ভেতরে থাকে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ রিফারবিশড বা ব্যবহৃত ফোন নতুন বলে বিক্রি। বিদেশ থেকে আনা পুরনো ফোন সফটওয়্যার পরিবর্তন করে নতুন মোড়কে বাজারজাত করা হয়। এছাড়া রয়েছে বৈধতা ছাড়া আমদানি করা সেট এনবিআর শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অথবা বিটিআরসি অনুমোদন ছাড়া দেশে আনা হয়। এসব ফোনের অধিকাংশেই বৈধ IMEI নম্বর নেই অথবা একই ওগঊও একাধিক হ্যান্ডসেটে ব্যবহৃত হয়, যা সরাসরি আইন লঙ্ঘন।
মোবাইল ফোন এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি নাগরিক জীবনের অপরিহার্য উপকরণ। ব্যাংকিং, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, সরকারি সেবা, শিক্ষাব্যবস্থা-সবকিছুই এখন মোবাইলনির্ভর। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র কিনতে গিয়ে গ্রাহকরা পড়ছেন বহুমাত্রিক প্রতারণার শিকার। ওয়ারেন্টি নেই বা ভুয়া ওয়ারেন্টি কার্ড, সফটওয়্যার আপডেট না পাওয়া, স্বাস্থ্যঝুঁকি (ব্যাটারি বিস্ফোরণ, অতিরিক্ত রেডিয়েশন), ডেটা সিকিউরিটির ঝুঁকি, কয়েক মাসের মধ্যেই ফোন অকেজো হয়ে যাওয়া। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো অনেক গ্রাহক প্রতারণার বিষয়টি বুঝতেই পারেন না বা জানলেও আইনি প্রতিকার পাওয়ার বিষয়ে অনাগ্রহী হন।
অবৈধ হ্যান্ডসেট শুধু ভোক্তা প্রতারণাই নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্যও মারাত্মক হুমকি। এছাড়া রয়েছে রাজস্ব ফাঁকি শুল্ক ও ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি তো আছেই। অনিবন্ধিত ওগঊও ব্যবহার করে অপরাধীরা সহজেই অপরাধ সংঘটিত করে পার পেয়ে যাচ্ছে। এসব কারনে অপরাধ অনুসন্ধানে মোবাইল ট্র্যাকিং অকার্যকর হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে অবৈধ হ্যান্ডসেট বাণিজ্য রোধে একাধিক আইন ও বিধিমালা রয়েছে, কিন্তু প্রয়োগে রয়েছে বড় ঘাটতি। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১ আইনের অধীনে অনুমোদন ছাড়া টেলিযোগাযোগ যন্ত্র আমদানি ও বিক্রি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। জরিমানা ও কারাদণ্ড উভয়ের বিধান রয়েছে। বিটিআরসি ওগঊও নিবন্ধন বিধিমালা, বৈধ হ্যান্ডসেট ব্যবহারের জন্য IMEI নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। নিবন্ধনবিহীন সেট বন্ধ করার ক্ষমতা বিটিআরসির রয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এ ভুয়া পণ্য বিক্রি করলে সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান। প্রতারিত গ্রাহক অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। দণ্ডবিধি, ১৮৬০: প্রতারণা (ধারা ৪১৫-৪২০) জালিয়াতি ও প্রতারণামূলক ব্যবসা পরিচালনার জন্য ফৌজদারি মামলা করা যায়।
প্রতারিত গ্রাহকদের জন্য আইনি পথ একেবারে বন্ধ নয়। গ্রাহগ প্রতারিত হলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করতে পারেন। এছাড়া বিটিআরসিতে ওগঊও সংক্রান্ত অভিযোগ, থানায় জিডি বা মামলা, মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা, দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণ মামলা করতে পারেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা জজ কোর্টের অ্যাডভোকেট কে এম খায়রুল আলম বাংলাদেশের খবরকে বলেন, বাস্তবতা হলো দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানির ভয়ে অধিকাংশ গ্রাহক এসব পথে হাঁটতে চান না। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল আইন থাকলেই চলবে না; প্রয়োজন দৃষ্টান্তমূলক ও ধারাবাহিক অভিযান। এছাড়া নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত, বিটিআরসি, র্যাব, পুলিশ ও ভোক্তা অধিদপ্তরের সমন্বিত অভিযান, বড় মার্কেটগুলোতে লাইসেন্স যাচাই, অবৈধ হ্যান্ডসেট জব্দ ও প্রকাশ্যে ধ্বংস, অপরাধী ব্যবসায়ীদের নাম প্রকাশ করতে হবে। তবে একটি বা দুটি অভিযানে সমস্যার সমাধান হবে না; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই অবৈধ বাণিজ্যের পেছনে রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। ছোট বিক্রেতারা অনেক সময় বড় আমদানিকারক ও পাইকারদের ওপর নির্ভরশীল। আবার কোথাও কোথাও প্রশাসনিক দুর্বলতা কিংবা অসাধু ব্যক্তিদের মদদ পাওয়ার অভিযোগও শোনা যায়।
জানতে চাইলে অ্যাড.মাকসুদা বেগম বলেন, অবৈধ হ্যান্ডসেট বিক্রি অজামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। মোবাইল দোকানের জন্য কঠোর লাইসেন্সিং ব্যবস্থা, গ্রাহক সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমে প্রচার, অনলাইন বিক্রির ক্ষেত্রেও নজরদারি, IMEI ব্লক কার্যক্রম আরো কার্যকর করা প্রয়োজন।
রাজধানী ঢাকার মোবাইল বাজারে অবৈধ হ্যান্ডসেটের দৌরাত্ম্য এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়; এটি একটি ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। গ্রাহক প্রতারণা, রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ক্ষতি ও জাতীয় নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। এখনই যদি কার্যকর আইন প্রয়োগ ও জরুরি অভিযান শুরু না হয়, তবে ভবিষ্যতে এই অনিয়ম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিককে সুরক্ষা দেয়া। সেই দায়িত্ব পালনে আর বিলম্ব নয়- অবৈধ মোবাইল বাণিজ্যের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর ও দৃশ্যমান অভিযান জরুরি।
বিকেপি/ এমএম

