ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন
দ্রুত বিচার নিশ্চিতে ৬৫৭ বিচারকের মনোনয়ন
আইনের শাসনের ইতিবাচক বার্তা
অ্যাড. মোহাম্মদ আলী
প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৫৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনকালীন অপরাধ দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সারাদেশে ৬৫৭ জন বিচারক মনোনীত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ।
নির্বাচন মানেই শুধু ভোট গ্রহণ নয়, এটি একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, যেখানে নাগরিকের মৌলিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো সরাসরি জড়িত। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা, ভোটকেন্দ্র দখল, হুমকি, কালো টাকা ও পেশিশক্তির অপব্যবহার- এসব অপরাধ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। এ প্রেক্ষাপটে বিচারকদের সক্রিয় উপস্থিতি আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় এক নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
দেশে নির্বাচনী অপরাধ নতুন কিছু নয়। ব্যালট পেপার ছিনতাই, ভুয়া ভোট প্রদান, প্রার্থী বা ভোটারকে হুমকি, নির্বাচনী প্রচারে সহিংসতা, ধর্ম বা সাম্প্রদায়িক উসকানি- এসব অপরাধ দীর্ঘদিন ধরেই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পথে বড় বাধা। অতীতে এসব অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া ছিল দীর্ঘসূত্রতা ও প্রভাবমুক্ত নয়, এমন অভিযোগও কম নয়। ফলে অপরাধীরা অনেক সময় পার পেয়ে গেছে, আর সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ভীতি ও অনাস্থা।
এ অবস্থায় নির্বাচনকালীন অপরাধের তাৎক্ষণিক বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিচারক মনোনয়ন একটি যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত। ভ্রাম্যমাণ আদালত ও দ্রুত বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে সঙ্গেই আইনের প্রয়োগ হলে অপরাধ প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসবে, এমনটাই প্রত্যাশা।
৬৫৭ জন বিচারকের মনোনয়ন নিঃসন্দেহে একটি বড় পরিসরের উদ্যোগ। তবে প্রশ্ন থেকে যায়- এই বিচারিক ব্যবস্থা কতটা স্বাধীন ও কার্যকরভাবে পরিচালিত হবে? শুধুমাত্র সংখ্যার দিক দিয়ে নয়, বিচারকদের নিরপেক্ষতা, সাহসিকতা ও প্রশাসনিক সহযোগিতা নিশ্চিত করাই এখানে মূল চ্যালেঞ্জ।
বিচারকরা যদি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপের বাইরে থেকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তাহলেই এই উদ্যোগ সার্থক হবে। অন্যথায় এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
আইনের শাসন ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা
নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। নির্বাচনকালীন অপরাধ দমনে বিচারক মনোনয়নের ক্ষেত্রে কমিশনের সক্রিয় ভূমিকা ইতিবাচক বার্তা দেয়। তবে এই ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় ও স্বচ্ছতা অপরিহার্য।
বিচারকদের দেওয়া আদেশ যেন মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়, সে দায়িত্ব প্রশাসনের। অতীতে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের আদেশ কার্যকর করতে গিয়ে প্রশাসনিক গড়িমসি বা দ্বিধা তৈরি হয়েছে। এবারের নির্বাচনে সে সুযোগ যেন না থাকে।
ভোটারের আস্থা ফিরিয়ে আনার সুযোগ
এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো- এটি ভোটারদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। একজন ভোটার যখন জানবেন, ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম বা সহিংসতার ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গেই বিচার হবে, তখন তিনি নির্ভয়ে ভোট দিতে আগ্রহী হবেন। গণতন্ত্রের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও একটি বার্তা যাবে-আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ সীমিত। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের শাস্তি তাৎক্ষণিক হলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে আশঙ্কাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা প্রয়োগে অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনকালীন সময়ে বিচারিক ক্ষমতা যেন প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়—সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, আইনি প্রক্রিয়ার ন্যূনতম মান রক্ষা-এসব বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি।
এছাড়া বিচারকদের প্রশিক্ষণ, নির্বাচন সংক্রান্ত বিশেষ আইন ও অপরাধের ধরন সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। নইলে মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ৬৫৭ জন বিচারক মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপ। এটি যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে নির্বাচনকালীন অপরাধ দমনে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে বিচারিক স্বাধীনতা, প্রশাসনিক সহযোগিতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
গণতন্ত্র শুধু ভোটের মাধ্যমে নয়, আইনের শাসনের মাধ্যমেই টিকে থাকে। এই উদ্যোগ সেই শাসন প্রতিষ্ঠার পথে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। নির্বাচন যেন সহিংসতা নয়, বরং জনগণের মতামতের উৎসব হয়ে ওঠে, এটাই জাতির প্রত্যাশা।
বিকেপি/এমএম

