Logo

আইন ও বিচার

বাণিজ্যিক আদালত

বিচারব্যবস্থায় সময়োপযোগী ও সাহসী সংস্কার

Icon

বায়েজিদ তাশরীক

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:০৪

বিচারব্যবস্থায় সময়োপযোগী ও সাহসী সংস্কার

একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা যতটা নির্ভর করে বিনিয়োগ, শিল্প ও বাণিজ্যের ওপর, ঠিক ততটাই নির্ভর করে কার্যকর ও দ্রুত বিচারব্যবস্থার ওপর। ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম বড় বাধা হলো দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চিত বিচারপ্রক্রিয়া। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকার কারণে যেমন বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হন, তেমনি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও পড়ে ঝুঁকির মুখে। এই বাস্তবতা অনুধাবন করেই সরকার প্রথমবারের মতো সারাদেশে বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে- যা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিক আদালত

বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম ঢাকা মহানগরসহ সারাদেশে বাণিজ্যিক আদালত গঠিত হলো। সরকার বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশ, ২০২৬-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে এসব আদালত প্রতিষ্ঠা করেছে। এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন গত ৩ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে জারি করা হয়েছে।

এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘদিনের জটিলতা ও অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ওঠার একটি কাঠামোগত পথ উন্মুক্ত হলো।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে মোট ৩টি বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

ঢাকার বাইরে গাজীপুর, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, বরিশাল- এই ছয়টি মহানগরের জন্য একটি করে পৃথক বাণিজ্যিক আদালত গঠন করা হয়েছে।

ফলে দেশের মহানগর এলাকায় মোট ১১টি বাণিজ্যিক আদালত কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে।

এছাড়া মহানগরের আদালতগুলোর পাশাপাশি জেলা পর্যায়ে আরও আদালত যুক্ত করে সারাদেশে মোট ৭৫টি বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা করা হলো। 

সংখ্যার দিক থেকে যেমন এটি উল্লেখযোগ্য, তেমনি এর তাৎপর্য আরও গভীর।

দেশে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিক মামলা পরিচালিত হয়ে আসছে সাধারণ দেওয়ানি আদালতে। ফলে বাণিজ্যিক মামলার সঙ্গে জমিজমা, পারিবারিক বা অন্যান্য দেওয়ানি মামলা একসঙ্গে চলেছে, ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তিতে সময় লেগেছে ১০-১৫ বছর, ব্যাংকঋণ আদায়, চুক্তি ভঙ্গ, আমদানি-রপ্তানি বিরোধে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ভাটা পড়েছে।

বিশেষায়িত আদালতের অভাবে বিচারকরা অনেক সময় বাণিজ্যিক জটিলতা ও আধুনিক কর্পোরেট কাঠামো সম্পর্কে পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি- এটিও বাস্তবতা।

নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট অঙ্কের ঊর্ধ্বে সকল বাণিজ্যিক বিরোধ বাণিজ্যিক আদালতে বিচারাধীন হবে, মামলার সময়সীমা নির্ধারিত থাকবে,

অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণ বন্ধে বিচারকের হাতে বিশেষ ক্ষমতা থাকবে, সাক্ষ্য গ্রহণ, যুক্তিতর্ক ও আদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে দ্রুততা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা হবে।

আইনের মূল দর্শন একটাই- ন্যায়বিচার বিলম্বিত হলে তা ন্যায়বিচার নয়। বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি স্পষ্ট ও ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে, ব্যবসায়িক চুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে,

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ আদায় সহজ হবে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তিতে গতি আসবে।

বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা সহজীকরণে ((Ease of Doing Business)) বাণিজ্যিক আদালতের ওপর জোর দিয়ে আসছিল। এই উদ্যোগ সেই সুপারিশেরই বাস্তব প্রতিফলন।

বিশ্বের উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে বিশেষায়িত আদালত নতুন কিছু নয়। শ্রম আদালত, পরিবেশ আদালত, পারিবারিক আদালতের মতোই বাণিজ্যিক আদালত বিচারব্যবস্থাকে আরও দক্ষ ও কার্যকর করে তোলে।

বাংলাদেশে এই ধারায় যুক্ত হলো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এতে বিচারকরা নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন, আইনজীবীরাও বাণিজ্যিক আইনে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠবেন, মামলার গুণগত মান বাড়বে।

তবে শুধু আদালত প্রতিষ্ঠা করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে- এমন ভাবার সুযোগ নেই। সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ১. দক্ষ জনবল :

বাণিজ্যিক আইন, কর্পোরেট ফাইন্যান্স ও আন্তর্জাতিক চুক্তি বিষয়ে দক্ষ বিচারক ও কর্মচারী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ জরুরি।

২. অবকাঠামো ও প্রযুক্তি : আদালতগুলোতে আধুনিক কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, ডিজিটাল নথি সংরক্ষণ ও ভার্চুয়াল শুনানির সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

৩. আইনজীবীদের মানসিক প্রস্তুতি : দীর্ঘসূত্রতার সংস্কৃতি ভেঙে দ্রুত বিচার মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ৪. নজরদারি ও জবাবদিহি : বাণিজ্যিক আদালত যেন নতুন করে মামলার জট সৃষ্টি না করে, সে জন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি।

শুধু মহানগরে সীমাবদ্ধ না রেখে জেলা পর্যায়ে বাণিজ্যিক আদালত স্থাপন একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত। কারণ দেশের বৃহৎ শিল্পাঞ্চল অনেক ক্ষেত্রে জেলার মধ্যেই অবস্থিত, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ঢাকায় এসে মামলা পরিচালনা করতে হিমশিম খান, স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত নিষ্পত্তি হলে ব্যবসা সচল থাকে। এ সিদ্ধান্ত উদ্যোক্তা বান্ধব বিচারব্যবস্থারই পরিচয় বহন করে।

একটি দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট হলে তার প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রের সব স্তরে। বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সরকার কার্যত একটি বার্তা দিয়েছে- ব্যবসায়িক ন্যায়বিচার আর বিলম্বিত হবে না।

এই আস্থা পুনর্গঠনই হবে এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

দেশে ৭৫টি বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে একটি সাহসী, সময়োপযোগী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। এটি শুধু বিচারব্যবস্থার সংস্কার নয়, এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে একটি দৃঢ় পদক্ষেপ।

এখন চ্যালেঞ্জ হলো- এই আদালতগুলো যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বাস্তবে দ্রুত, দক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার নিশ্চিত করে।

যদি তা সম্ভব হয়, তবে বলা যায়—বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা এক নতুন যুগে পা রাখল; যেখানে বাণিজ্য আর অনিশ্চয়তার ভারে থমকে থাকবে না, বরং আইনের সুরক্ষায় এগিয়ে যাবে নিশ্চিন্ত পথে। 

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর