নির্বাচন ও পুলিশ : নিরপেক্ষতার প্রশ্নে ‘জিরো টলারেন্স’
মাসুম আহম্মেদ
প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:২০
নির্বাচন মানেই শুধু ব্যালট, কেন্দ্র আর প্রার্থী নয়- নির্বাচন মানেই রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে এক পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করানো। সেই পরীক্ষার মূল প্রশ্ন একটাই: নিরপেক্ষতা আছে কি না। এই নিরপেক্ষতার সবচেয়ে বড় ও স্পর্শকাতর দায়িত্ব যাদের ওপর বর্তায়, তারা হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশ।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ ছিবগাত উল্লাহ স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন, পুলিশ সদস্যরা নির্বাচন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো পোস্ট, মন্তব্য, ছবি কিংবা তথ্য শেয়ার করতে পারবেন না। এমনকি নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো প্রতিক্রিয়া জানানোও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নির্দেশনাটি কঠোর, কিন্তু সময়োপযোগী ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ নেই। একটি পোস্ট, একটি মন্তব্য কিংবা একটি ছবি মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে হাজারো মানুষের কাছে। সেখানে একজন পুলিশ সদস্যের বক্তব্য বা ইঙ্গিত সাধারণ নাগরিকের বক্তব্যের মতো নয়, তা রাষ্ট্রের অবস্থান হিসেবেই বিবেচিত হয়।
নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল সময়ে পুলিশের কোনো সদস্য যদি কোনো প্রার্থী বা দল নিয়ে মন্তব্য করেন, কোনো কেন্দ্রের ছবি বা তথ্য শেয়ার করেন, কিংবা নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ দেন, তাহলে তা শুধু শৃঙ্খলা ভঙ্গ নয়, বরং নির্বাচনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করার শামিল।
অতীত অভিজ্ঞতা বলে, এ ধরনের পোস্ট থেকেই গুজব ছড়ায়, উত্তেজনা তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঝুঁকির মুখে পড়ে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান শক্তি তাদের অস্ত্র নয়, ক্ষমতা নয়, নিরপেক্ষতা। নির্বাচনকালীন সময়ে পুলিশ কোনো দলের পক্ষে নয়, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধেও নয়। তাদের অবস্থান একটাই, আইনের পক্ষে। এই কারণেই নির্বাচন কমিশন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহল বারবার পুলিশ সদস্যদের স্মরণ করিয়ে দেয়- “আপনারা নির্বাচনের অংশ নন, আপনারা নির্বাচনের রক্ষক।” সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ‘লাইক’ কিংবা ‘শেয়ার’ও সেই নিরপেক্ষ অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে, এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে মাঠ প্রশাসনের ওপর দায়িত্ব বাড়ছে বহুগুণে। নির্বাচনী এলাকা, ভোটকেন্দ্র, প্রার্থীদের প্রচারণা, ভোটারদের উপস্থিতি, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি থাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
এই প্রেক্ষাপটে সিআইডির মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী সকল পুলিশ সদস্যকে ইতোমধ্যে হেডকোয়ার্টার্স থেকে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ক বিশেষ নির্বাচনী প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
নির্বাচনী প্রশিক্ষণে মূলত যে বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, তা হলো নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পূর্ণ নীরবতা পালন, গোপন তথ্য বা অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি প্রকাশ না করা, নির্বাচনী আইন ও আচরণবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ, প্রয়োজন ছাড়া শক্তি প্রয়োগ না করা।
প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো- নির্বাচন সংক্রান্ত যে কোনো তথ্য কেবল দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেই প্রকাশযোগ্য।
মাঠ পর্যায়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, নির্বাচনের প্রাক্কালে স্থানীয় পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মাঠে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ ব্রিফিং প্রদান করবেন।
এই ব্রিফিংয়ের লক্ষ্য এলাকা ভিত্তিক ঝুঁকি চিহ্নিত করা, সম্ভাব্য সংঘাতের স্থান নির্ধারণ, রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে সতর্ক করা, আচরণগত সীমারেখা স্পষ্ট করা। কারণ মাঠপর্যায়ে একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা একটি ভুল আচরণ পরিস্থিতিকে মুহূর্তেই ঘোলাটে করে তুলতে পারে।
নির্বাচনকালীন সময়ে পুলিশ একা কাজ করে না। তাদের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়- নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা, প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে।
নির্দেশনায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, সমন্বয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করতে হবে, যেন সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
এখানে অহংকার বা একক সিদ্ধান্তের সুযোগ নেই; আছে শুধু দলগত দায়িত্ববোধ।
এক সময় পুলিশ সদস্যের আচরণ সীমাবদ্ধ ছিল মাঠে। এখন তার আচরণ দেখা যায় ফেসবুক টাইমলাইনে, ইউটিউব মন্তব্যে, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে। এ কারণেই আধুনিক সময়ে পুলিশ সদস্যদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ- অনলাইন আচরণ নিয়ন্ত্রণ।
একটি অপ্রয়োজনীয় পোস্ট নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে, বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে, এমনকি একটি কেন্দ্রে সহিংসতার সূত্রপাত ঘটাতে পারে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
পুলিশ সদস্যরা সরকারি কর্মচারী হিসেবে সরকারি আচরণবিধি ও পুলিশ আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কর্তব্যরত অবস্থায় বা নির্বাচনকালীন সময়ে এসব নির্দেশনা অমান্য করা হলে বিভাগীয় শাস্তি, সাময়িক বরখাস্ত, এমনকি ফৌজদারি ব্যবস্থারও সুযোগ রয়েছে।
অতএব এটি শুধু নৈতিক নির্দেশনা নয়, এটি একটি বাধ্যতামূলক প্রশাসনিক আদেশ।
আস্থার জায়গা তৈরি করতে হবে নির্বাচনের সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করে জনগণের আস্থার ওপর। জনগণ যদি বিশ্বাস করে- পুলিশ নিরপেক্ষ, পুলিশ কারও পক্ষ নেয় না, পুলিশ আইনের বাইরে যায় না, তাহলেই নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়। সেই আস্থা নষ্ট করার জন্য একটি পোস্টই যথেষ্ট- আর আস্থা ফেরাতে লাগে বছরের পর বছর।
নির্বাচন ঘিরে পুলিশ সদস্যদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নীরব থাকার নির্দেশনা কোনো মৌলিক অধিকার হরণ নয়; বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের অংশ। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অস্ত্র, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব পাওয়ার বিনিময়ে কিছু ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণে রাখা অস্বাভাবিক নয়, বিশেষ করে নির্বাচনের মতো স্পর্শকাতর সময়ে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে সিআইডি প্রধানের এই নির্দেশনা সময়োপযোগী, বাস্তবসম্মত এবং প্রশংসার যোগ্য। এখন প্রয়োজন এর কঠোর ও সমান প্রয়োগ। কারণ নির্বাচন সুষ্ঠু হলে কৃতিত্ব যেমন সবার, তেমনি কোনো ব্যর্থতার দায়ও সবার। নিরপেক্ষ পুলিশই পারে একটি নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে।
বিকেপি/এমবি

