Logo

আইন ও বিচার

রিমান্ড কি জিজ্ঞাসাবাদ, নাকি নির্যাতন

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৩৪

রিমান্ড কি জিজ্ঞাসাবাদ, নাকি নির্যাতন

‘রিমান্ড’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ পুনঃপ্রেরণ। ফৌজদারি মামলায় এই শব্দটি মূলত আসামিকে আদালতের অনুমতিতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাময়িকভাবে পুনরায় পুলিশ হেফাজতে নেওয়াকে বোঝায়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রিমান্ড কখনোই জিজ্ঞাসাবাদের নামে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের অনুমতি দেয় না। কিন্তু বাস্তবে রিমান্ড শব্দটি এখন সাধারণ মানুষের কাছে ভয় ও আতঙ্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৬৭ ও ৩৪৪ ধারায় রিমান্ডের বিধান থাকলেও কোথাও ‘রিমান্ড’ শব্দটির সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি। কার্যবিধির ১৬৭ ধারা অনুযায়ী, পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তারের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত শেষ করা সম্ভব না হলে এবং অভিযোগ বস্তুনিষ্ঠ মনে হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিকটবর্তী ক্ষমতাসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে রিমান্ড আবেদন করতে পারেন। এক বা একাধিক দফায় এই রিমান্ডের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১৫ দিনের বেশি হতে পারে না।

দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রেও রিমান্ডের আদেশ হয়ে থাকে। আপিল আদালত বা উচ্চতর আদালত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কোনো মামলা পুনরায় বিচারিক আদালতে ফেরত পাঠাতে পারেন। দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর ৪১ আদেশে রিমান্ডের পক্ষে ও বিপক্ষে যেসব বিধান রয়েছে, সেগুলোর উদ্দেশ্যও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।

আইন অনুযায়ী পুলিশ একটি দায়িত্বশীল বাহিনী এবং হেফাজত একটি নিরাপদ স্থান হওয়ার কথা। তবে বাস্তবতায় পুলিশ হেফাজত অনেক সময় অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্য ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় পুলিশকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হলেও গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার বেশি আটকে রাখার সুযোগ নেই। এই সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ না হলে তাকে তদন্ত প্রতিবেদনসহ নিকটতম প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হাজির করতে হয়।

বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ও ৩৬৪ ধারার বিধান অনুসরণ করে জবানবন্দি রেকর্ড করতে পারেন। আটককৃত ব্যক্তি জবানবন্দি দিতে অস্বীকার করলে তাকে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে। বিশেষ কারণ দেখাতে পারলে পুলিশ পুনরায় রিমান্ড আবেদন করতে পারে, যা ম্যাজিস্ট্রেটের সন্তুষ্টির ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষার নিশ্চয়তা দিয়েছে। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনানুযায়ী ব্যতীত কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম ও সম্পত্তির ক্ষতি করা যাবে না। ৩৫ অনুচ্ছেদের (৩), (৪) ও (৫) উপধারায় দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত বিচার, নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য না করা এবং কোনো ধরনের নির্যাতন বা নিষ্ঠুর আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অন্ধকার কুঠুরিতে আটকে রেখে নির্যাতন সংবিধানবিরোধী।

তবু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। দেখা যায়, গ্রেপ্তারের সময় সুস্থ ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করার সময় হুইলচেয়ারে আনা হয়। চোর-ডাকাত থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা কিংবা শিক্ষার্থীরাও রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায়ের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।

রিমান্ডে নির্যাতনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ১৯৯৮ সালে একটি রিট দায়ের করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল হাইকোর্ট বিভাগ ১৫ দফা নির্দেশনা দিয়ে ছয় মাসের মধ্যে আইন সংশোধনের নির্দেশ দেন। ২০১৬ সালে আপিল বিভাগ ওই রায় বহাল রাখে। কিন্তু আইনজ্ঞদের মতে, আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও রিমান্ডের অপব্যবহার কমেনি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, রিমান্ডে আসামিদের ওপর অন্তত ১৪ ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে উল্টো ঝুলিয়ে মারধর, মুখে কাপড় গুঁজে পানি ঢালা, বৈদ্যুতিক শক দেওয়া, আঙুলের নখ উপড়ে ফেলা- এমনকি যৌনাঙ্গে নির্যাতনের অভিযোগও। এসব নির্যাতনের মাধ্যমে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের নজিরও পাওয়া গেছে।

হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের সময় আঘাতের চিহ্ন থাকলে তার কারণ লিখে চিকিৎসকের সনদ নিতে হবে, আটককৃত ব্যক্তিকে আইনজীবী ও নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দিতে হবে এবং রিমান্ডের আগে ও পরে ডাক্তারি পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রিমান্ড একটি বৈধ আইনগত প্রক্রিয়া হলেও এর অপব্যবহার আইনের শাসন ও মানবাধিকারের পরিপন্থী। রিমান্ড মানে জিজ্ঞাসাবাদ—নির্যাতন নয়- এই নীতিকে কার্যকর করতে হলে আদালতের নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর