Logo

আইন ও বিচার

‘বিশেষ পরিস্থিতি’ ধারায় বৈধতার সুযোগ

বাল্যবিবাহ রোধে আইনি সুরক্ষায় প্রশ্ন

Icon

কৈলাশ খান

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৪৪

বাল্যবিবাহ রোধে আইনি সুরক্ষায় প্রশ্ন

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিয়ন্ত্রণে প্রধান আইন হলো Child Marriage Restraint Act, ২০১৭। এ আইনে নারীদের জন্য ন্যূনতম বিয়েযোগ্য বয়স ১৮ বছর এবং পুরুষদের জন্য ২১ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৯২৯ সালের ব্রিটিশ আমলের আইন বাতিল করে প্রণীত এই আইনে বাল্যবিবাহের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি- সংগঠক, কাজী, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টদের জন্য কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

তবে আইনটির একটি বিতর্কিত ধারা- ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের লক্ষ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশ্লেষকেরা। আইনের ১৯ ধারায় বলা হয়েছে, ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ বিবেচনায় নিয়ে আদালত অভিভাবকের সম্মতিতে ন্যূনতম বয়স অতিক্রম না করলেও বিয়েকে বৈধ ঘোষণা করতে পারেন। এই বিধানকে ঘিরেই দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, সে বিষয়ে আইনে কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। একই সঙ্গে কিশোরী বা কিশোরের মতামত গ্রহণের বাধ্যবাধকতাও সুস্পষ্ট নয়। কোনো নির্দিষ্ট ন্যূনতম ব্যতিক্রমী বয়স (minimum exception age) নির্ধারণ না থাকায় এই ধারা কার্যত ন্যূনতম বিয়েযোগ্য বয়সকে শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনার ঝুঁকি তৈরি করছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, এই ধারা কিছু ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহকে অপ্রত্যক্ষভাবে আইনি বৈধতা দিচ্ছে। ফলে মেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। এ কারণে ২০১৭ সালের পর থেকে একাধিক দেশিয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও সরকারকে ধারাটি সংশোধন অথবা কঠোরভাবে ব্যাখ্যা করার আহ্বান জানিয়ে আসছে।

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার এখনও উদ্বেগজনকভাবে বেশি। বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। আইনি সংস্কারের ঘোষণা আসার পর কিছু গ্রামীণ এলাকায় বাল্যবিবাহের প্রবণতা আরও বেড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শাস্তির আশঙ্কায় গোপনে আগেভাগেই বিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছে।

আইনে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে কমিটি গঠন, প্রশাসনিক নজরদারি এবং মনিটরিংয়ের কথা বলা হলেও বাস্তবে মামলা দায়ের, বিচারিক প্রক্রিয়া ও দণ্ড কার্যকরে নানা দুর্বলতার কথা উঠে এসেছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে বাল্যবিবাহ নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রয়োগ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

এ বিষয়ে আইনজীবী অ্যাডভোকেট রাজা মিয়া বলেন, “বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ আইনত অপরাধ হলেও ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ ধারার অস্পষ্টতা এবং বাস্তব প্রয়োগের দুর্বলতা এই প্রথাকে টিকিয়ে রাখছে। রাষ্ট্র যদি বাস্তব অগ্রগতি চায়, তবে আইন সংশোধন, কিশোরীর মতামতকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দেওয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।”

বিশ্লেষকদের মতে, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে শুধু আইন থাকলেই যথেষ্ট নয়; আইনের ভাষা, প্রয়োগ ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় না হলে কিশোরীদের অধিকার ও সুরক্ষা ঝুঁকির মধ্যেই থেকে যাবে।

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর