Logo

আইন ও বিচার

মামলা ছাড়াই সন্ত্রাস দমন

কতটা বৈধ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা?

Icon

রাকিব খান

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৫১

কতটা বৈধ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা?

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে আইন সব সময় কেবল দণ্ডমূলক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশেষত সন্ত্রাসবাদ- যা সরাসরি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা, জননিরাপত্তা ও সাংবিধানিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে- তা মোকাবিলায় রাষ্ট্রকে কখনো কখনো প্রতিরোধমূলক ও ব্যতিক্রমী ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট মামলা না থাকলেও, রাষ্ট্র কি তাকে আইনের আওতায় আনতে পারে?

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের আইনব্যবস্থা এই প্রশ্নের উত্তর শর্তসাপেক্ষে ইতিবাচক। সংবিধান, ফৌজদারি আইন ও বিশেষ আইনসমূহ রাষ্ট্রকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দিলেও সেই ক্ষমতার ওপর স্পষ্ট সীমারেখা আরোপ করেছে।

বাংলাদেশ সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকারসমূহ সুরক্ষিত। ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আইনের আশ্রয়ের নিশ্চয়তা দিলেও, সংবিধান নিজেই এই অধিকারের ওপর যুক্তিসংগত সীমাবদ্ধতা আরোপের সুযোগ রেখেছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ৩৩ অনুচ্ছেদ, যেখানে আইনানুযায়ী গ্রেপ্তার ও আটক এবং প্রতিরোধমূলক আটককে সংবিধানসম্মত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, “মামলা না থাকলেও আটক”- এই ধারণাকে সংবিধান নীতিগতভাবে অস্বীকার করেনি।

ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর বিধানও এই ধারণাকে শক্ত ভিত্তি দেয়। ধারা ৫৪ অনুযায়ী, পুলিশ যুক্তিসংগত সন্দেহের ভিত্তিতে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারে, যদি কেউ আমলযোগ্য অপরাধে জড়িত বা জড়াতে পারে বলে আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে ধারা ১৫১ রাষ্ট্রকে অপরাধ সংঘটনের আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেয়। এতে স্পষ্ট হয়, ফৌজদারি আইন কেবল প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং প্রতিরোধমূলক চরিত্রও বহন করে।

মামলা ছাড়াই আটক সংক্রান্ত সবচেয়ে আলোচিত আইন বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪। এই আইনের অধীনে জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা বা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকলে সরকার প্রতিরোধমূলক আটক দিতে পারে। সুপ্রিম কোর্ট একাধিক রায়ে উল্লেখ করেছে, আইনটি নিজে অসাংবিধানিক নয়; বরং এর অপব্যবহারই অসাংবিধানিক।

সন্ত্রাস দমনে সবচেয়ে কার্যকর আইন হিসেবে বিবেচিত সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ রাষ্ট্রকে আরও বিস্তৃত ক্ষমতা দিয়েছে। এই আইনের আওতায় সন্ত্রাসী সংগঠন নিষিদ্ধ করা যায় এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য হওয়া, অর্থায়ন করা বা সহায়তা প্রদান শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কোনো নির্দিষ্ট অপরাধ সংঘটিত না হলেও, সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে ব্যক্তি আইনের আওতায় পড়তে পারে। এতে গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থার আইনি স্বীকৃতি রয়েছে।

বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গিতে উচ্চ আদালত বারবার বলেছেন, ব্যক্তিস্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ঊর্ধ্বে নয়। তবে প্রতিরোধমূলক আটক হতে হবে যৌক্তিক, নির্দিষ্ট ও সময়সীমাবদ্ধ। এই বিচারিক নজরদারিই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রিত রাখে।

আন্তর্জাতিক পরিসরেও এই অবস্থান অস্বীকৃত নয়। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (ICCPR) জাতীয় জরুরি অবস্থায় জননিরাপত্তার স্বার্থে ব্যক্তিস্বাধীনতা সীমিত করার সুযোগ দেয়। বাংলাদেশ এই সনদের সদস্য হওয়ায় তার আইনগত কাঠামো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।

তবে আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, মামলা ছাড়াই আটক ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি অস্বীকার করা যায় না। অতীতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই ক্ষমতার ব্যবহার আইনের নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফলে আইনের শক্তি তখনই কার্যকর হয়, যখন তার প্রয়োগ হয় ন্যায়সংগত ও উদ্দেশ্যনিষ্ঠভাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের আইনব্যবস্থা সন্ত্রাস দমনে মামলা ছাড়াই ব্যবস্থা নেওয়ার বৈধতা দেয়, তবে তা কঠোর শর্ত ও বিচারিক তত্ত্বাবধানে সীমাবদ্ধ। শক্তিশালী রাষ্ট্র মানে শুধু কঠোর আইন নয়; বরং এমন আইন, যা নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কিন্তু ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারকে অক্ষুণ্ন রাখে।

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর