বৈদেশিক চুক্তি সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার কতটুকু?
সংবিধান ও আইনের আলোকে স্বচ্ছতার প্রশ্ন
আইন আদালত ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:০৪
বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সম্পাদিত বৈদেশিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (MOU) প্রকাশ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। সামরিক সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি, ঋণ ও বাণিজ্য-এসব চুক্তির আর্থিক ও নীতিগত দায় শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই বর্তায়। অথচ বহু ক্ষেত্রে এসব চুক্তির শর্ত, মেয়াদ ও দায়বদ্ধতা জনসমক্ষে আসে না। ফলে প্রশ্ন উঠছে- বাংলাদেশের জনগণের কি বৈদেশিক চুক্তি সম্পর্কে জানার সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার রয়েছে?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধান সরাসরি বৈদেশিক চুক্তি প্রকাশের নির্দেশনা না দিলেও একাধিক অনুচ্ছেদ জনগণের জানার অধিকারকে সমর্থন করে। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে, যা তথ্য জানার অধিকার ছাড়া অর্থবহ হতে পারে না। একই সঙ্গে ১১ অনুচ্ছেদে ঘোষিত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার নীতির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা ও জনগণের অবহিত থাকার বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রক্ষমতার মালিক জনগণ। ফলে রাষ্ট্রের পক্ষে সম্পাদিত আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পর্কেও জনগণের জানার যৌক্তিক অধিকার রয়েছে বলে মনে করেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, পররাষ্ট্রনীতি ও বৈদেশিক প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জনগণ অজ্ঞাত থাকলে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
২০০৯ সালে প্রণীত তথ্য অধিকার আইন সরকারি নথি ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার আইনি সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই আইনের আওতায় সরকারি দপ্তর ও বৈদেশিক সহায়তাপ্রাপ্ত সংস্থা থেকে তথ্য চাওয়ার বিধান রয়েছে। তবে আইনের ৩২ ধারায় জাতীয় নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ক্ষতির আশঙ্কায় কিছু তথ্য প্রকাশের ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। এর ফলে বাস্তবে বহু বৈদেশিক চুক্তির খসড়া বা গুরুত্বপূর্ণ ধারা প্রকাশ পায় না।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, তথ্য অধিকার আইন পুরো চুক্তি গোপন রাখার অনুমতি দেয় না; বরং কেবল সংবেদনশীল অংশ সীমিত রাখার সুযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে চুক্তির কাঠামো, আর্থিক দায় ও মেয়াদ প্রকাশযোগ্য হলেও বাস্তবে তা নিয়মিতভাবে করা হয় না।
আন্তর্জাতিক পরিসরে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে বৈদেশিক চুক্তি সংসদীয় অনুমোদনের আওতায় আসে। যুক্তরাষ্ট্রে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে চুক্তি অনুমোদন বাধ্যতামূলক। ভারতেও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও অর্থনৈতিক চুক্তি সংসদে আলোচনার রেওয়াজ রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানে বৈদেশিক চুক্তি সংসদে উপস্থাপনের বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে নির্বাহী বিভাগই এ বিষয়ে সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকে।
সরকারি নীতি নির্ধারকদের যুক্তি, অনেক আন্তর্জাতিক চুক্তিতে গোপনীয়তা রক্ষা আন্তর্জাতিক রীতির অংশ। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও কৌশলগত অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে আগাম প্রকাশ কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অন্যদিকে নাগরিক সমাজের দাবি, চুক্তির পুরোটা নয়—অন্তত নীতিগত কাঠামো ও আর্থিক দায় সম্পর্কে জনগণকে জানানো সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈদেশিক চুক্তিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়—সম্পূর্ণ প্রকাশযোগ্য, আংশিক প্রকাশযোগ্য ও সংবেদনশীল। শিক্ষা, সংস্কৃতি, পরিবেশ ও উন্নয়ন সহযোগিতার চুক্তি সাধারণত প্রকাশযোগ্য। বড় ঋণ ও অবকাঠামো প্রকল্প আংশিক প্রকাশযোগ্য, আর প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা চুক্তি সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত।
স্বচ্ছতা বাড়াতে গবেষকরা প্রস্তাব করেছেন- চূড়ান্ত বৈদেশিক চুক্তি সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ, সংসদে আলোচনার বিধান প্রণয়ন এবং তথ্য অধিকার আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। তাদের মতে, স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব।
সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বৈদেশিক চুক্তি সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা বিবেচনায় সীমাবদ্ধতা থাকলেও জনগণের ওপর প্রভাব ফেলা বড় চুক্তিগুলো সম্পর্কে তথ্য উন্মুক্ত করাই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।
বিকেপি/এমএম

