জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে জরিপ ও বিভ্রান্তি : গণতন্ত্র কোন পথে?
মাসুম আহম্মেদ
প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৪০
আর মাত্র দুদিন পরেই বহুকাক্সিক্ষত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই ভালো কিছু আশার পাশাপাশি জনসাধারণের মধ্যে শঙ্কাও বাড়ছে।
নির্বাচনী প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। এর মধ্যে প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে আলোচনায় এসছে। আর তা হলো বিভিন্ন সংস্থা ও দৈনিক পত্রিকার পক্ষ থেকে প্রকাশিত তথাকথিত জনমত যাচাই জরিপ বা জনমত জরিপ। কোথাও বলা হচ্ছে- অমুক দল বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে, কোথাও বলা হচ্ছে- ভোটার উপস্থিতি কম হবে, আবার কোথাও দাবি করা হচ্ছে- জনগণ বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকছে। এসব জরিপ কতটা সত্য, কতটা বিশ্বাসযোগ্য এবং সর্বোপরি এর আইনগত ভিত্তি কী? সে প্রশ্ন আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত হলো জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশ। নির্বাচন সেই মতপ্রকাশের সর্বোচ্চ ও সাংবিধানিক রূপ। অথচ নির্বাচনের আগেই যদি নানা ধরনের জরিপ ও পূর্বাভাস দিয়ে ভোটারদের মানসিকভাবে প্রভাবিত করা হয়, তাহলে সেই স্বাধীনতা কতটা অক্ষুণ্ন থাকে- তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। বিশেষ করে যখন জরিপের পদ্ধতি, নমুনা বা তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া স্পষ্ট নয়, তখন তা জনমতকে আলোকিত করার বদলে বিভ্রান্ত করার আশঙ্কাই বেশি।
জনমত জরিপ মূলত একটি গবেষণামূলক প্রক্রিয়া। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে নির্দিষ্ট নীতিমালা ও কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করে এ ধরনের জরিপ পরিচালিত হয়। সেখানে জরিপের নমুনা কতজন, কোন এলাকায়, কোন শ্রেণির ভোটার- সবই প্রকাশ করা হয়। এমনকি ভুলের সম্ভাব্য হার (margin of error) পর্যন্ত জানানো হয়। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় অধিকাংশ জরিপেই এসব মৌলিক তথ্য অনুপস্থিত। ফলে জরিপের ফলাফল যতটা না তথ্যনির্ভর, তার চেয়ে বেশি হয়ে ওঠে অনুমাননির্ভর।
যেহেতু আইনি চর্চায় আছি সেহেতু আমার পরিচিত অনেকেই জানতে চেয়েছেন- নির্বাচনের আগে এ ধরনের জরিপ কি আইনসম্মত?
বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচনী আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২। এই আইনে নির্বাচন পরিচালনা, প্রচারণা, আচরণবিধি ও অপরাধ সংক্রান্ত নানা বিধান রয়েছে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো আরপিওতে সরাসরি মনমত জরিপ বা নির্বাচন-পূর্ব পূর্বাভাস সংক্রান্ত কোনো স্পষ্ট বিধান নেই। অর্থাৎ আইন নীরব। তবে আইন নীরব বলেই যে সবকিছু বৈধ- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যুক্তিসঙ্গত নয়।
নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী তফসিল ঘোষণার পর এমন কোনো কর্মকাণ্ড করা যাবে না, যা ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারে বা নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন করে। প্রশ্ন হলো- একটি জরিপ যদি প্রকাশ্যে ঘোষণা করে দেয় যে অমুক দল নিশ্চিতভাবে জয়ী হচ্ছে, তবে তা কি ভোটারকে মানসিকভাবে প্রভাবিত করে না? অনেক ভোটার ‘জয়ী দলে’ ভোট দেওয়ার প্রবণতায় ভোগেন, আবার অনেকে মনে করেন- ভোট দিয়ে লাভ নেই। এভাবে জরিপ সরাসরি ভোটার আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে- ভুয়া বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত জরিপ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজনৈতিক পক্ষ বা স্বার্থান্বেষী মহল অর্থের বিনিময়ে জরিপ তৈরি করিয়ে তা সংবাদ বা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। উদ্দেশ্য একটাই- এক পক্ষকে অতিরিক্ত শক্তিশালী দেখানো এবং অন্য পক্ষকে দুর্বল প্রমাণ করা। এটিকে এক ধরনের ‘মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণা’ বললেও অত্যুক্তি হবে না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
ভুয়া জরিপ শুধু ভোটারদের বিভ্রান্ত করে না, রাজনৈতিক দলগুলোকেও ভুল কৌশলে ঠেলে দেয়। কোনো দল যদি ভুয়া জরিপ দেখে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়ে, তবে মাঠপর্যায়ে কাজ শিথিল হতে পারে। আবার কোনো দল যদি নিজেদের অতিমাত্রায় পিছিয়ে মনে করে, তবে হতাশা ও ভাঙন সৃষ্টি হতে পারে। অর্থাৎ ভুয়া তথ্য পুরো নির্বাচনী পরিবেশকে বিষাক্ত করে তোলে।
এখানে সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দৈনিক পত্রিকা শুধু খবর প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি জনমত গঠনের শক্তিশালী হাতিয়ার। তাই জরিপ প্রকাশের আগে সংবাদপত্রের দায়িত্ব হলো তার উৎস, পদ্ধতি ও বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা। জরিপ যদি প্রকাশ করতেই হয়, তবে সেটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে নয়, একটি সীমিত গবেষণা হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত। ‘সম্ভাব্য’, ‘ধারণাভিত্তিক’, ‘নির্দিষ্ট নমুনার ওপর নির্ভরশীল’- এমন সতর্কীকরণ স্পষ্টভাবে থাকা জরুরি।
সুতরাং, নির্বাচনের আগে বৈজ্ঞানিকভাবে ও স্বচ্ছভাবে পরিচালিত জনমত জরিপ করা হতে পারে, কিন্তু এটি আইনের লঙ্ঘন না করে সঠিক পদ্ধতিতে ও নীতি অনুসারে প্রকাশ করা উচিত। জরিপের পদ্ধতি, নমুনা, ডেটা সংগ্রহের সময়, প্রশ্নের ফ্রেমিং ইত্যাদি সংবাদে প্রকাশ করলে পাঠক তা নিজেদের রায় গঠনে সহায়কভাবে ব্যবহার করতে পারে।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই গণতন্ত্রে তথ্য প্রবাহ বন্ধ করা যায় না, করা উচিতও নয়। কিন্তু তথ্য ও অপতথ্যের পার্থক্য না করতে পারলে সেই প্রবাহই গণতন্ত্রকে দুর্বল করে দেয়। নির্বাচন কমিশনের এখানেও দায়িত্ব রয়েছে। কমিশন চাইলে নির্বাচনী আচরণ বিধির আওতায় জরিপ প্রকাশের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে। যেমন- তফসিল ঘোষণার পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জরিপ প্রকাশ নিষিদ্ধ করা, বা জরিপ প্রকাশে বাধ্যতামূলক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
নারী, যুবক ও পুরুষ সবাই যখন ভোট দিতে বের হন, তার আগে তাদের সামনে সঠিক, নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে জনমত জরিপ একটি সহায়ক উপাদান হতে পারে, যদি তা সত্য, স্বচ্ছ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয় এবং ওই তথ্য বিতরণের সময় কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য বা পূর্বগোপনীয় উদ্দেশ্য না থাকে।
সংবিধান-আইন ও নির্বাচনী আচরণ বিধির spirit অনুযায়ী, একই সঙ্গে ভুয়া তথ্য ও অযাচিত নির্বাচনী প্রচার থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক গণতান্ত্রিক সমাজের প্রত্যাশা। সংবাদ ও সমীক্ষার পেশাদারিত্ব ও সততা বজায় রেখে অভিগম্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা আমাদের নির্বাচনের পরিবেশকে আরও শক্তিশালী, নিরপেক্ষ এবং বিশ্বাসযোগ্য করতে পারি এটাই আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
আমাদের স্মরণ রাখতে হবে- ভোট কোনো খেলা নয়, কোনো পণ্যের বাজারও নয়। এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার প্রয়োগের আগে নাগরিককে বিভ্রান্ত করা মানে তার অধিকারকে পরোক্ষভাবে হরণ করা। জরিপ যদি সত্যিই জনমত তুলে ধরে, তবে তা গবেষণার স্বার্থে সীমিত পরিসরে থাকতে পারে। কিন্তু যদি তা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক তৈলমর্দনের হাতিয়ার, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।
অতএব, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জরিপ নিয়ে বাড়তি সতর্কতা জরুরি। সংবাদপত্রকে হতে হবে দায়িত্বশীল, নির্বাচন কমিশনকে হতে হবে সজাগ এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে হতে হবে সংযত। ভোটারই এই দেশের প্রকৃত মালিক- তার সিদ্ধান্ত যেন কোনো ভুয়া জরিপের ছায়ায় ঢাকা না পড়ে, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
গণতন্ত্র টিকে থাকে বিশ্বাসের ওপর। আর সেই বিশ্বাস ভাঙে মিথ্যা, বিভ্রান্তি ও অসততার মাধ্যমে। নির্বাচন-পূর্ব জরিপ যদি সেই বিশ্বাসকে দুর্বল করে, তবে তা নিয়ন্ত্রণের সময় এখনই। অন্যথায় নির্বাচন হবে, কিন্তু গণতন্ত্র প্রশ্নের মুখে পড়বে- এ আশঙ্কা অমূলক নয়।
বিকেপি/এমএম

