Logo

আইন ও বিচার

বীমা খাতে আস্থার সংকট

প্রতারণার দায় কার?

Icon

আইন ও আদালত ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৫২

প্রতারণার দায় কার?

‘ইন্স্যুরেন্স’ বা বীমা- এই শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তা ও আর্থিক সুরক্ষার ধারণা। জীবন, স্বাস্থ্য, দুর্ঘটনা কিংবা সম্পদের ঝুঁকি মোকাবিলায় বীমাকে আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাস্তব বাংলাদেশে এই খাত ক্রমেই আস্থার সংকটে পড়ছে। গ্রাহকদের অভিযোগের তালিকায় রয়েছে ভুয়া প্রতিশ্রæতি, দাবি পরিশোধে গড়িমসি, কাগজপত্রের অজুহাতে টাকা আটকে রাখা এবং অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ দাবি বাতিল করে দেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়ম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্স্যুরেন্স খাতে প্রতারণা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি একটি কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সাধারণ গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি প্রচলিত প্রতারণার ধরন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রথমত, ভ্রান্ত ও অতিরঞ্জিত প্রলোভন। গ্রাহক আকর্ষণে অনেক এজেন্ট ও ডেভেলপমেন্ট অফিসার এমন সব সুবিধার কথা বলেন, যা বাস্তবে পলিসির শর্তে নেই। “মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে টাকা”, “চিকিৎসা খরচ শতভাগ ফেরত” বা “মেয়াদ শেষে দ্বিগুণ অর্থ”- এ ধরনের আশ্বাসে পলিসি নেওয়ার পর দাবি জানাতে গিয়ে গ্রাহক দেখতে পান সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা।

দ্বিতীয়ত, দাবি নিষ্পত্তিতে অযৌক্তিক বিলম্ব। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে অনেক কোম্পানি মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর দাবি ঝুলিয়ে রাখে। নতুন কাগজপত্র, পুনঃতদন্ত ও নানা অজুহাতে গ্রাহককে ক্লান্ত ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়।

তৃতীয়ত, সূ² শর্তের ফাঁদ। দীর্ঘ ও জটিল পলিসি শর্ত সাধারণ গ্রাহকের পক্ষে বোঝা কঠিন। অনেক সময় ক্ষুদ্র অক্ষরে লেখা অস্পষ্ট শর্ত দেখিয়ে দাবি বাতিল করা হয়, যা নৈতিকতা ও ভোক্তা অধিকারের পরিপন্থী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

চতুর্থত, এজেন্টকেন্দ্রিক অনিয়ম। কিছু অসাধু এজেন্ট প্রিমিয়াম গ্রহণ করেও তা কোম্পানিতে জমা দেন না কিংবা ভুয়া রসিদ প্রদান করেন। পরে গ্রাহক জানতে পারেন—তার পলিসিই কার্যকর নয়।

বাংলাদেশে ইন্স্যুরেন্স খাত পরিচালিত হচ্ছে বীমা আইন, ২০১০, সংশ্লিষ্ট বিধিমালা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর মাধ্যমে। কাগজে-কলমে আইন ও তদারকি কাঠামো শক্তিশালী হলেও বাস্তবে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আইন অনুযায়ী জরিমানা, লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের বিধান থাকলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির খুব কম। অভিযোগ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা ও তদন্তের ধীরগতি আইনের প্রয়োগকে দুর্বল করে তুলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইন্স্যুরেন্স প্রতারণার দায় এককভাবে কোম্পানির ওপর চাপালে পূর্ণ চিত্র উঠে আসে না। দায় বহুমুখী। প্রথমত, কোম্পানির- কারণ তারা গ্রাহকের আস্থার ওপর ভিত্তি করেই ব্যবসা পরিচালনা করে। দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রক সংস্থার- কার্যকর নজরদারি ও কঠোর শাস্তি না থাকলে অনিয়ম বাড়ে। তৃতীয়ত, এজেন্ট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের- যারা দুর্বল তদারকির সুযোগ নিয়ে প্রতারণায় জড়ায়। পাশাপাশি রাষ্ট্রের সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিও এই সমস্যাকে জিইয়ে রাখছে।

এই প্রতারণার সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ গ্রাহকরা। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা কিংবা পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুর মতো সংকটময় সময়ে বীমার অর্থ না পেয়ে অনেক পরিবার চরম আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। এটি কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং একটি গুরুতর সামাজিক অবিচার।

এই সংকট থেকে উত্তরণে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের কথা বলছেন। দাবি নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, সময় লঙ্ঘনে স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ, এজেন্ট ব্যবস্থার সংস্কার, লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্টদের তথ্য প্রকাশ এবং অনিয়মকারীদের স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে। পাশাপাশি সহজ ভাষায় পলিসি শর্ত ব্যাখ্যা ও স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি ট্রাইব্যুনাল বা ওমবাডসম্যান ব্যবস্থা চালুর সুপারিশও রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইন্স্যুরেন্স খাতের মূল ভিত্তি আস্থা। সেই আস্থা ভেঙে পড়লে শুধু একটি শিল্প নয়, পুরো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়ে। এখন প্রশ্ন আর প্রতারণা হচ্ছে কি না—তা নয়; প্রশ্ন হলো, এই প্রতারণা বন্ধে সংশ্লিষ্ট সবাই কতটা আন্তরিক। আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে এখনই কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর