নির্বাচন-পরবর্তী সংখ্যালঘু নিরাপত্তা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়
মাসুম আহম্মেদ
প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:১৬
জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক জীবনের সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে জনগণ শুধু সরকার গঠনের রায়ই দেয় না, বরং রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি আস্থা ও প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশও ঘটায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য- বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের পরপরই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। সহিংসতা, ভীতি প্রদর্শন, বাড়িঘর ভাঙচুর, মন্দিরে আক্রমণ, জমি দখল কিংবা সামাজিক বয়কট এসব ঘটনায় বারবার কলঙ্কিত হয় আমাদের নির্বাচন-পরবর্তী অধ্যায়।
এই বাস্তবতা কেবল মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় নয়; এটি সরাসরি সংবিধান, আইনের শাসন ও রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির ওপর আঘাত।
সংখ্যালঘু নিরাপত্তা কেন নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ? দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচন-পরবর্তী সময় একটি সংবেদনশীল অধ্যায়। পরাজয়ের ক্ষোভ, প্রতিশোধপরায়ণতা, ক্ষমতার পালাবদলে স্থানীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এসবের সহজ শিকার হয়ে ওঠে সংখ্যালঘুরা। কারণ তারা সংখ্যায় কম, রাজনৈতিকভাবে দুর্বল এবং অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোর বাইরে অবস্থান করে।
বিশেষ করে যেসব সংখ্যালঘু ভোটাররা প্রকাশ্যে একটি রাজনৈতিক অবস্থান নেন বা নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তাদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ প্রতিশোধমূলক হামলা চালানো হয়। বাস্তবে এটি রাজনৈতিক সহিংসতার মুখোশে সাম্প্রদায়িক অপরাধ।
সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান।
২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা জন্মস্থানভিত্তিক বৈষম্য নিষিদ্ধ। ৪১ অনুচ্ছেদে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। অতএব, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর যে কোনো আক্রমণ কেবল একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপরাধ নয়; এটি সরাসরি সংবিধান লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রের ব্যর্থতা।
আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগের ঘাটতি রয়েছে- এটাই আমাদের বড় সংকট। দণ্ডবিধি, বিশেষ ক্ষমতা আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, এমনকি নির্বাচনী অপরাধ সংক্রান্ত বিধান—সবই বিদ্যমান। তবুও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নজির খুব কম। ফলে একটি ভয়াবহ বার্তা ছড়িয়ে পড়ে- সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করলে শাস্তি হয় না। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি (culture of impunity)ই ভবিষ্যতের সহিংসতাকে উৎসাহিত করে।
নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রশাসনের একটি অংশ কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে- এ অভিযোগ নতুন নয়। স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপ, রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা ‘পরিস্থিতি শান্ত রাখার’ অজুহাতে অনেক ক্ষেত্রে হামলার ঘটনা লঘু করে দেখা হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- শান্তি কি ভয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে? সংখ্যালঘু পরিবারগুলো যখন রাতের অন্ধকারে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়, তখন সেটিকে ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে’ বলা যায় না। এটি রাষ্ট্রের পরাজয়।
নির্বাচন কমিশনের দায় শেষ হয় না ফল ঘোষণায়। সাধারণভাবে মনে করা হয়- ভোট গণনা ও ফল ঘোষণার মধ্য দিয়েই নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব শেষ। এই ধারণা আইনগত ও নৈতিকভাবে ভুল। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান; নির্বাচনের সার্বিক পরিবেশ ও পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করাও তার দায়িত্বের অংশ।
নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা যদি ভোটের প্রভাব, ফলাফলের প্রতিক্রিয়া বা রাজনৈতিক প্রতিশোধের ফল হয়, তাহলে কমিশনের উচিত তা নথিভুক্ত করা, তদন্তের সুপারিশ করা এবং প্রয়োজনে পুনঃনির্বাচন বা আইনগত পদক্ষেপের উদ্যোগ নেওয়া।
গণতন্ত্র কেবল ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণই গণতন্ত্রের মান নির্ধারণ করে। বিজয়ী দলের উচিত বিজয়কে প্রতিশোধের হাতিয়ার না বানানো, আর পরাজিত দলের উচিত সংখ্যালঘুদের ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে চিহ্নিত করে উসকানি না দেওয়া।
নেতৃত্বের একটি স্পষ্ট বার্তা- “সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা রাজনৈতিক অপরাধ”- এই বার্তা মাঠপর্যায়ে না গেলে সহিংসতা থামবে না।
নির্বাচন-পরবর্তী সংখ্যালঘু নির্যাতনের অনেক ঘটনা স্থানীয় পর্যায়েই চাপা পড়ে যায়। মূলধারার গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হলো এসব ঘটনা তথ্যভিত্তিকভাবে তুলে ধরা অতিরঞ্জন নয়, আবার নীরবতাও নয়।
সঠিক তথ্য, ভুক্তভোগীর কণ্ঠ, আইনি প্রেক্ষাপট- এই তিনের সমন্বয়েই গণমাধ্যম একটি প্রতিরোধক শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি উদীয়মান অর্থনীতি ও শান্তিরক্ষী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী সংখ্যালঘু নির্যাতনের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে সংখ্যালঘু সুরক্ষা শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে এখনই কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। যেমন ১. নির্বাচন-পরবর্তী ৯০ দিন সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ২. সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল বা বিশেষ প্রসিকিউশন সেল, ৩. নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে সহিংসতা মনিটরিং সেল, ৪. রাজনৈতিক দলের আচরণবিধিতে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান, ৫. ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা কোনো দয়ার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে যদি একটি নাগরিক তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তবে সে নির্বাচন যতই গ্রহণযোগ্য হোক- গণতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে পরিপক্ব করতে হলে নির্বাচন শুধু সুষ্ঠু হলেই চলবে না; নির্বাচন-পরবর্তী সময়ও হতে হবে নিরাপদ, ন্যায়সঙ্গত ও মানবিক। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে সেই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
বিকেপি/এমএম

