Logo

আইন ও বিচার

ব্যাংক ঋণে গ্যারান্টর : সহানুভূতির স্বাক্ষর যেন সর্বনাশের দলিল

Icon

মাসম আহম্মেদ

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:০৫

ব্যাংক ঋণে গ্যারান্টর : সহানুভূতির স্বাক্ষর যেন সর্বনাশের দলিল

ব্যাংক ঋণ নিতে গিয়ে অনেকেই স্বজন, বন্ধু বা পরিচিত কাউকে গ্যারান্টর হিসেবে দাঁড় করান। সম্পর্কের খাতিরে, ভবিষ্যৎ সহযোগিতার আশায় কিংবা সামাজিক চাপে- বিনা দ্বিধায় অনেকে গ্যারান্টর হন। কিন্তু ঋণ খেলাপি হলে সেই গ্যারান্টরের কাঁধেই নেমে আসে আইনগত ও আর্থিক দায়ের ভার। ব্যাংক লোনে গ্যারান্টরের দায় আসলে কী? কতটা, কোন পর্যায়ে, এবং কীভাবে এই দায় থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়?

গ্যারান্টর হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি ঋণগ্রহীতার ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে ব্যাংককে অর্থ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেন। ব্যাংকের দৃষ্টিতে গ্যারান্টর হলো দ্বিতীয় ঋণগ্রহীতা- যার আর্থিক সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নির্ভর করেই অনেক সময় ঋণ অনুমোদন হয়। অর্থাৎ গ্যারান্টর হওয়া নিছক সাক্ষী হওয়া নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিভিত্তিক দায়।

গ্যারান্টরের দায় নির্ধারিত হয় মূলত গ্যারান্টি ডিড/চুক্তির শর্তে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চুক্তিতে থাকে- ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে গ্যারান্টর সম্পূর্ণ ঋণের জন্য দায়ী। ব্যাংক আগে ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। সুদ, দণ্ডসুদ, খরচসহ সব পাওনা গ্যারান্টরের ওপর বর্তাতে পারে।

অনেকে না পড়েই স্বাক্ষর করেন এটাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত কিস্তি না দিলে ব্যাংক প্রথমে নোটিশ দেয়। খেলাপি অব্যাহত থাকলে ঋণগ্রহীতার পাশাপাশি গ্যারান্টরকে আইনি নোটিশ, দেওয়ানি মামলা/অর্থঋণ মামলা,

আদালতের ডিক্রি হলে গ্যারান্টরের সম্পত্তি জব্দ ও নিলাম, ক্রেডিট রিপোর্টে নেতিবাচক প্রভাব- ভবিষ্যতে নিজের ঋণ নেওয়াও কঠিন, অর্থাৎ গ্যারান্টর হওয়া মানে নিজের আর্থিক ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে ফেলা।

“আগে ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন”- এই যুক্তি কতটা টেকে? আইনগতভাবে অধিকাংশ গ্যারান্টি চুক্তিতে Joint and Several Liability থাকে- মানে ব্যাংক চাইলে সরাসরি গ্যারান্টরের কাছেই টাকা চাইতে পারে। আগে ঋণগ্রহীতার সব সম্পদ শেষ করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা সাধারণত নেই। আদালতও চুক্তির শর্তকেই প্রাধান্য দেয়।

গ্যারান্টরের সম্পত্তি কি ঝুঁকিতে পড়ে? হ্যাঁ। ডিক্রি হলে গ্যারান্টরের  জমি, ফ্ল্যাট, ব্যাংক হিসাব, বেতন (আইনসীমার মধ্যে), অন্যান্য সম্পদ জব্দ ও নিলামের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এমনকি গ্যারান্টরের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের বিরুদ্ধেও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দাবি উঠতে পারে।

সব গ্যারান্টি একরকম নয়। সচেতন হলে গ্যারান্টর  সীমিত অঙ্কের গ্যারান্টি (Limited Guarantee) দিতে পারেন। সময়সীমাবদ্ধ গ্যারান্টি নির্ধারণ করতে পারেন, সুদ/দণ্ডসুদের দায় সীমিত করতে পারেন, কিন্তু এগুলো স্পষ্টভাবে চুক্তিতে লেখা না থাকলে আদালতে কার্যকর হয় না।

ব্যাংকের উচিত গ্যারান্টরকে ঝুঁকির বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানানো। নীতিগতভাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার তদারক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দেয়- চুক্তি স্বচ্ছ ও ন্যায্য হতে হবে। তবে বাস্তবে দায়িত্ব অনেকটাই পড়ে গ্যারান্টরের নিজের ওপর- চুক্তি পড়া, বোঝা ও প্রশ্ন করার।

কখন গ্যারান্টর কিছুটা সুরক্ষা পান?

কিছু পরিস্থিতিতে গ্যারান্টরের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো যায়- ব্যাংক চুক্তির শর্ত ভেঙে ঋণের শর্ত একতরফাভাবে বদলালে, জালিয়াতি বা প্রতারণার মাধ্যমে স্বাক্ষর নেওয়া হলে, ঋণগ্রহীতার সঙ্গে গোপন সমঝোতায় ব্যাংক গ্যারান্টরের ক্ষতি করলে, তবে এসব প্রমাণ করা কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ।

বাংলাদেশে গ্যারান্টর হওয়া অনেক সময় সামাজিক বাধ্যবাধকতা। কিন্তু মনে রাখতে হবে সম্পর্ক টেকে না, চুক্তি টেকে। ঋণ শোধ না হলে বন্ধুত্ব রক্ষা করে না আদালত “একটা সই” কখনো কখনো সর্বস্বান্ত করে দেয়। সুতরাং আবেগ নয়, আইনি বাস্তবতা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের।

গ্যারান্টর হওয়ার আগে করণীয় : ১) পুরো চুক্তি পড়–ন ও বুঝুন, ২) ঋণগ্রহীতার আয়, ব্যবসা ও পরিশোধ সক্ষমতা যাচাই করুন, ৩) সীমিত ও সময়সীমাবদ্ধ গ্যারান্টির শর্ত যুক্ত করুন, ৪) ফাঁকা কাগজে কখনো স্বাক্ষর করবেন না, ৫) প্রয়োজনে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

ব্যাংক ঋণে গ্যারান্টর হওয়া কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি একটি গুরুতর আইনগত ও আর্থিক দায়। ঋণগ্রহীতার ব্যর্থতা গ্যারান্টরের জীবনে নেমে আসতে পারে দুর্যোগ হিসেবে। তাই সচেতন সিদ্ধান্ত, স্পষ্ট চুক্তি ও আইনি বোঝাপড়াই পারে এই ঝুঁকি কমাতে। মনে রাখতে হবে- সহানুভূতির স্বাক্ষর যেন ভবিষ্যতের সর্বনাশের দলিল না হয়।

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর