Logo

আইন ও বিচার

শিশু সাক্ষী ও শিশু ভিকটিমের অধিকার সুরক্ষায় আইন কতটা কার্যকর?

Icon

অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:১১

শিশু সাক্ষী ও শিশু ভিকটিমের অধিকার  সুরক্ষায় আইন কতটা কার্যকর?

মানব পাচার একটি নীরব কিন্তু ভয়াবহ অপরাধ, যার সবচেয়ে করুণ শিকার হচ্ছে শিশুরা। দারিদ্র্য, অশিক্ষা, সামাজিক বৈষম্য ও দুর্বল আইন প্রয়োগ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা শিশুদের যৌন শোষণ, জোরপূর্বক শ্রম, ভিক্ষাবৃত্তি, গৃহকর্ম, এমনকি অঙ্গ পাচারের মতো জঘন্য অপরাধে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে এই অপরাধ শুধু সীমান্ত পেরিয়ে নয়, দেশের ভেতরেও বিস্তৃত আকার ধারণ করেছে। এই বাস্তবতায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন শিশু ভিকটিম ও শিশু সাক্ষীর অধিকার কতটা নিশ্চিত করছে?

দেশে মানব পাচার রোধে প্রণীত হয় “মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২”। এই আইন প্রণয়নের মূল লক্ষ্য ছিল মানব পাচার অপরাধকে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা, পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান করা, ভিকটিমদের উদ্ধার, পুনর্বাসন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণ করা। বিশেষভাবে এই আইনে নারী ও শিশুকে সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভিকটিম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের নিচে কোনো ব্যক্তি মানব পাচারের শিকার হলে তিনি শিশু ভিকটিম হিসেবে গণ্য হবেন, এবং তার ক্ষেত্রে সম্মতি বা অসম্মতির প্রশ্ন প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ শিশু যদি স্বেচ্ছায়ও কোথাও যেতে রাজি হয়, তবুও তা মানব পাচার হিসেবে বিবেচিত হবে। এই বিধান শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মানবাধিকারসম্মত।

মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন অনুযায়ী শিশু ভিকটিমের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নিরাপদ উদ্ধার ও হেফাজতের অধিকার। শিশু ভিকটিমকে উদ্ধার করার পর তাকে থানা হেফাজতে নয়, বরং নিরাপদ শিশু আশ্রয়কেন্দ্র বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে রাখতে হবে। গোপনীয়তার অধিকার- আইন অনুযায়ী শিশু ভিকটিমের নাম, ছবি, ঠিকানা বা পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা অনুসরণ বাধ্যতামূলক। এই বিধান লঙ্ঘন শিশুর ভবিষ্যৎ সামাজিক পুনর্বাসনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

শিশু ভিকটিম শুধু উদ্ধার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের দায়িত্ব চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা প্রদান, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, পরিবারে বা বিকল্প পরিবারে পুনঃএকত্রীকরণ। মানব পাচার মামলায় শিশু শুধু ভিকটিম নয়, অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষী হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু শিশু সাক্ষী হওয়া মানেই মানসিক চাপ, অপরাধীর ভয়, পুনরায় ট্রমার শিকার হওয়া, এই কারণেই আইন শিশু সাক্ষীর জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা রেখেছে।

আইন অনুযায়ী, শিশু সাক্ষীর জবানবন্দি বন্ধ কক্ষে (In-camera trial) গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে ভিডিও কনফারেন্স বা বিশেষ কক্ষের মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণ করা যাবে। এর উদ্দেশ্য হলো শিশুকে অভিযুক্তের সরাসরি উপস্থিতি থেকে রক্ষা করা। পুনঃপুন জিজ্ঞাসাবাদের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। একই ঘটনার জন্য শিশুকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে না। কারণ এটি শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। 

শিশু সাক্ষী ও ভিকটিম উভয়ের জন্য রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী, প্রবেশন অফিসার, সমাজকর্মীর সহায়তা নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে। এছাড়া বিচার প্রক্রিয়ায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। তাই শিশু সাক্ষী ও শিশু ভিকটিমের অধিকার সুরক্ষায় আইনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

বিকেপি/এমএম 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর