সড়কে বেড়েছে অবৈধ পার্কিং আইন মানছেন না কেউ
মাসুম আহম্মেদ
প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:১০
ছবি:বাংলাদেশের খবর
রাজধানী ঢাকার সড়ক মানেই যানজট- এমন ধারণা এখন আর কেবল কথার কথা নয়, বরং প্রতিদিনকার বাস্তবতা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই যানজটকে আরও তীব্র করে তুলছে এক নীরব কিন্তু সর্বব্যাপী সমস্যা অবৈধ পার্কিং। ব্যস্ত সড়কের এক পাশ দখল করে রাখা ব্যক্তিগত গাড়ি, দোকানপাটের সামনে সারি সারি মোটরসাইকেল, অফিস-আদালতের আশপাশে দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থাকা প্রাইভেটকার সব মিলিয়ে রাজধানীর সড়ক কার্যত সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
এই অবৈধ পার্কিং শুধু যান চলাচল ব্যাহত করছে না; সৃষ্টি করছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, জরুরি সেবার বিঘœ এবং সাধারণ মানুষের সীমাহীন ভোগান্তি।
রাজধানীর প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবৈধ পার্কিং এখন নিত্যদিনের চিত্র। বিশেষ কওে মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ফার্মগেট ও তেজগাঁও, গুলিস্তান, পল্টন ও প্রেসক্লাব এলাকা ধানমন্ডি, কলাবাগান, মিরপুর ১০ ও কাজীপাড়া উত্তরা সেক্টর এলাকাগুলো। এসব এলাকায় সড়কের এক পাশ তো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে দুই পাশেই অবৈধভাবে যানবাহন পার্ক করা থাকে। ফলে দুই লেনের সড়ক নেমে আসে এক লেনে, কোথাও কোথাও কার্যত একমুখী চলাচলেও অচলাবস্থা তৈরি হয়।
ধানমন্ডি থেকে ফার্মগেট যেতে যেখানে স্বাভাবিক সময়ে ১০-১৫ মিনিট লাগার কথা, সেখানে অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে অনেক সময় এক ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স কেউই রেহাই পাচ্ছে না।
ফার্মগেট এলাকায় এক পথচারী গতকাল সকালে ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাদেশের খবরকে বলেন, “বাস দাঁড়ানোর জায়গা নেই, ফুটপাত দখল, আবার সড়কে গাড়ি পার্কিং। আমরা হাঁটব কোথায়, চলব কীভাবে?
সড়কের মাঝামাঝি হঠাৎ পার্ক করা গাড়ির কারণে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় অপর্যাপ্ত আলো ও সংকেতহীন পার্কিং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ট্রাফিক পুলিশের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে সংঘটিত দুর্ঘটনার পেছনে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অবৈধ পার্কিং দায়ী।
সড়কে অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও তার প্রয়োগ খুবই দুর্বল। মোটরযান অধ্যাদেশ ও সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী- নির্ধারিত স্থানের বাইরে গাড়ি পার্ক করা দণ্ডনীয় অপরাধ, জরিমানা ও যানবাহন জব্দের বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে শিথিলতা চোখে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে নিয়মিত ‘ম্যানেজ’ ও প্রভাবের কারণে অনেক গাড়িই নির্বিঘেœ দিনের পর দিন সড়কে দাঁড়িয়ে থাকে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্বে। অভিযান হয়, কিন্তু তা অনেক সময় ক্ষণস্থায়ী। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন পার্কিং স্পেস নির্ধারণ ও অবকাঠামো গড়ে তোলার দায়িত্ব তাদের। কিন্তু জনসংখ্যা ও যানবাহনের তুলনায় পার্কিং সুবিধা অত্যন্ত অপ্রতুল। নিয়ম অনুযায়ী নিজস্ব পার্কিং রাখার কথা থাকলেও অনেক ভবন মালিক তা মানছেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীতে পার্কিং সংকট কেবল অবকাঠামোগত নয়, এটি একটি ব্যবস্থাপনাগত ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাও।
একদিকে পর্যাপ্ত পাবলিক পার্কিং নেই, পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ। অন্যদিকে ‘এখানেই একটু রাখি’ মানসিকতা, আইন অমান্যের সংস্কৃতি, প্রভাবশালীদের জন্য আইনের শিথিলতা, সব মিলিয়ে অবৈধ পার্কিং যেন এক প্রাতিষ্ঠানিক বিশৃঙ্খলায় পরিণত হয়েছে।
ডিএমপি নিয়মিত অভিযান চালালেও স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না। কারণ হিসেবে জানা যায়, নিয়মিত তদারকির অভাব, রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ, জরিমানার অঙ্ক কম, জব্দকৃত গাড়ি ছাড়াতে ‘সহজ পথ’। ফলে অভিযান শেষ হলেই আগের চিত্র ফিরে আসে।
ভুক্তভোগীরা নগরবাসীর প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। নির্ধারিত পার্কিং স্পেস, কঠোর ও নিয়মিত আইন প্রয়োগ, প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রেও সমান আইন, গণপরিবহন ও ফুটপাত মুক্ত রাখা।
সংবাদকর্মী সাইফুল ইসলাম খান এ প্রসঙ্গে বলেন, “সড়ক তো ব্যক্তিগত গ্যারেজ নয়। আইন সবার জন্য সমান হলে এই ভোগান্তি কমবে।”
বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এলাকাভিত্তিক বহুতল পার্কিং ভবন, স্মার্ট পার্কিং ব্যবস্থাপনা, অবৈধ পার্কিংয়ে কঠোর জরিমানা ও জব্দ, ভবন অনুমোদনে পার্কিং শর্ত কঠোরভাবে মানা, নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি,
এসব উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন না হলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
রাজধানীর সড়কে অবৈধ পার্কিং এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়; এটি একটি নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। আইন আছে, দায়িত্বশীল সংস্থা আছে, অভিযোগও নতুন নয়- তবু সমাধান নেই। এই অবস্থা চলতে থাকলে যানজট, দুর্ঘটনা ও জনভোগান্তি আরও বাড়বে।
রাজধানীর সড়ক কি সত্যিই সবার জন্য, নাকি প্রভাবশালীদের অবৈধ পার্কিংয়ের জন্য? এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দিতে হবে কথায় নয়, কার্যকর পদক্ষেপে।
বিকেপি/এমএম

