রমজানে পণ্য মজুদ রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জরুরি
মাসুম আহম্মেদ
প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:০৬
রমজান সংযম, সহমর্মিতা ও ন্যায়ের মাস। অথচ বাস্তবতা বলছে- এই পবিত্র মাস এলেই এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারকে জিম্মি করে তোলে। চাল, ডাল, তেল, চিনি, ছোলা, খেজুর থেকে শুরু করে পেঁয়াজ সবকিছুতেই হঠাৎ অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার অজুহাতে দাম বাড়ে; পরে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, পণ্য আছে কিন্তু গুদামে। মজুদদারি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির এই প্রবণতা শুধু ভোক্তার পকেট কাটে না; সামাজিক ন্যায়বোধকেও আঘাত করে। তাই রমজানে পণ্য মজুদ রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান আর বিলাসিতা নয়-এটি সময়ের অনিবার্য দাবি।
বাংলাদেশে মজুদদারি নতুন নয়। তবে রমজানকে কেন্দ্র করে এর মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। একদিকে চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে; অন্যদিকে অসাধু চক্র এই সুযোগে সরবরাহ শৃঙ্খলে কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি করে। পাইকারি বাজারে পণ্য আটকে রেখে খুচরা বাজারে সংকট দেখানো হয়। ফলে দাম বাড়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ। রাজধানী ঢাকা-সহ বড় শহরগুলোতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়লেও গ্রামাঞ্চলও রেহাই পায় না।
ভোক্তা অধিকার বনাম লোভের বাজার
সংবিধান ভোক্তার ন্যায্যতার কথা বলে; রাষ্ট্রের দায়িত্ব বাজারকে শৃঙ্খলিত রাখা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, আইন থাকলেও প্রয়োগে শিথিলতা। বাজার তদারকি নিয়মিত না হলে আইন কাগুজে বাঘে পরিণত হয়। এখানেই ভ্রাম্যমান আদালতের কার্যকারিতা প্রশ্নাতীত। তাৎক্ষণিক বিচার, জরিমানা, পণ্য জব্দ- এসবের সম্মিলিত প্রভাবই অসাধুদের মনে ভয় তৈরি করে। রমজানের মতো সংবেদনশীল সময়ে এই ভয়টাই সবচেয়ে দরকার।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের বড় শক্তি হলো তাৎক্ষণিকতা। বাজারে অভিযান চালিয়ে সঙ্গে সঙ্গে অনিয়ম ধরতে পারা যায়। গুদামে লুকানো পণ্য বের করে বাজারে ছাড়ার নির্দেশ দিলে সরবরাহ বাড়ে, দাম স্বাভাবিক হয়। দীর্ঘসূত্রতা কমে; ভোক্তা দ্রুত স্বস্তি পায়। একই সঙ্গে এটি একটি শক্ত বার্তা দেয়- রাষ্ট্র চোখ বন্ধ করে নেই।
নজরদারির ঘাটতি ও সমন্বয়ের অভাব
সমস্যা কেবল অসাধু ব্যবসায়ী নয়; সমস্যা প্রশাসনিক সমন্বয়েরও। বাজার তদারকিতে একাধিক সংস্থা জড়িত থাকলেও অনেক সময় দায়িত্বের সীমারেখা অস্পষ্ট। কোথাও তথ্য আসে দেরিতে, কোথাও সিদ্ধান্ত। ফলে সুযোগ নেয় মজুদদাররা। রমজানের আগে থেকেই সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা না থাকলে শেষ মুহূর্তের অভিযান ফলপ্রসূ হয় না।
রমজানের অন্তত এক মাস আগে থেকেই বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ জরুরি। কোন পণ্যের আমদানি কত, স্থানীয় উৎপাদন কত- এসব তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য চিহ্নিত করতে হবে। গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে গুদাম, আড়ত ও বড় পাইকারদের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালত যেন কেবল প্রদর্শনী না হয়ে কার্যকর শাস্তির হাতিয়ার হয়- সেদিকে নজর জরুরি।
শুধু জরিমানা নয়, পুনরাবৃত্ত অপরাধে লাইসেন্স স্থগিত, গুদাম সিলগালা, এমনকি ফৌজদারি মামলার নজির স্থাপন করতে হবে। কয়েকটি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই অনেককে লাইনে আনতে পারে। গণমাধ্যমে এসব অভিযানের স্বচ্ছ প্রচারও গুরুত্বপূর্ণ যাতে বাজারে বার্তা পৌঁছায়।
ভোক্তারাও দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। অতিরিক্ত কিনে ঘরে মজুদ করলে সংকট আরও বাড়ে। একই সঙ্গে অনিয়ম দেখেও নীরব থাকা অপরাধকে উৎসাহিত করে। অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা, হটলাইন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কার্যকর করতে হবে- যাতে ভোক্তা নির্বিঘ্নে তথ্য দিতে পারেন।
ডিজিটাল ইনভেন্টরি ট্র্যাকিং, পাইকারি দামের রিয়েল-টাইম মনিটরিং, আমদানি-উৎপাদন ডেটার সমন্বয়- এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করলে মজুদদারি আগেই ধরা পড়তে পারে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে এসব তথ্য যুক্ত হলে সিদ্ধান্ত হবে দ্রুত ও নির্ভুল।
নৈতিকতার প্রশ্ন: রমজানের শিক্ষা
রমজান কেবল উপবাসের মাস নয়; এটি নৈতিকতার মাস। ধর্মীয় মূল্যবোধের দোহাই দিয়ে ব্যবসায় লোভের আগুন জ্বালানো চরম দ্বিচারিতা। মজুদদারি শুধু আইনভঙ্গ নয়- এটি সামাজিক ও নৈতিক অপরাধ। রাষ্ট্র যখন কঠোর হয়, তখন সমাজের নৈতিক বোধও শক্ত হয়।
রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে বাজার স্থিতিশীলতা সামাজিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত। নিত্যপণ্যের দাম লাগামছাড়া হলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রমজানে ইফতার-সেহরির টেবিলে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হলে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানকে নিয়মিত, ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ করতে হবে।
রমজানে পণ্য মজুদ রোধে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান কোনো সাময়িক ব্যবস্থা নয়- এটি একটি নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। আইন প্রয়োগের দৃঢ়তা, প্রশাসনিক সমন্বয়, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ভোক্তার সচেতনতা- এই চার স্তম্ভে দাঁড়ালেই বাজারে শৃঙ্খলা ফিরবে। অন্যথায় প্রতি বছর একই অভিযোগ, একই ভোগান্তি, একই আশ্বাসের বৃত্তেই ঘুরপাক খাবে সমাজ। রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করতে হলে এখনই সময়। কথা নয়, কঠোর ও কার্যকর অভিযান।
বিকেপি/এমএম

