Logo

আইন ও বিচার

আইন কলেজের মান বাড়াতে প্রয়োজন মনিটরিং

Icon

সোমা কবীর

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:২০

আইন কলেজের মান বাড়াতে প্রয়োজন মনিটরিং

আইন শিক্ষা কেবল একটি পেশাগত ডিগ্রি নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থা, গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক শাসনের মেরুদণ্ড। যে দেশে আইন শিক্ষা দুর্বল, সে দেশে বিচার ব্যবস্থাও দুর্বল হয়- এই সত্য নতুন নয়। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ-এ বেসরকারি আইন কলেজগুলোর শিক্ষা পদ্ধতি ও মান নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, এমনকি অভিজ্ঞ আইনজীবীরাও বাংলাদেশের খবরকে বলছেন, আইন কলেজ বাড়ছে, কিন্তু মান বাড়ছে না। এই বাস্তবতায় বেসরকারি আইন কলেজগুলোর ওপর কার্যকর ও নিয়মিত মনিটরিং এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।

আইন কলেজের সংখ্যা বাড়ছে, মান কমছে :

গত এক দশকে দেশে বেসরকারি আইন কলেজের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শিক্ষার চাহিদা, আইন পেশার প্রতি আগ্রহ এবং সহজ ভর্তি প্রক্রিয়া সব মিলিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কিন্তুএসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান কি সমানভাবে নিশ্চিত হয়েছে? বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে অনেক ক্ষেত্রেই নয়।

কিছু কলেজে পর্যাপ্ত পূর্ণকালীন শিক্ষক নেই, কোথাও নেই মানসম্মত গ্রন্থাগার, কোথাও আবার নিয়মিত ক্লাসই হয় না। অথচ সিলেবাস শেষ করার তাগিদে শিক্ষার্থীরা নোটনির্ভর পড়াশোনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। এতে আইন শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য বিশ্লেষণী চিন্তা, যুক্তি ও ন্যায়বোধ ব্যাহত হচ্ছে।

আইন শিক্ষা কোনো সাধারণ শিক্ষা নয়। এখান থেকে বেরিয়ে আসা শিক্ষার্থীরাই ভবিষ্যতে আইনজীবী, বিচারক, প্রসিকিউটর, সরকারি আইন কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারক হবেন। তাঁদের হাতে থাকবে মানুষের জীবন, সম্পদ ও অধিকার সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। ফলে আইন শিক্ষার মানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দেশের বিচারব্যবস্থার মান।

রাষ্ট্র যখন একটি আইন কলেজকে অনুমোদন দেয়, তখন সেটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন নয়; বরং ভবিষ্যৎ ন্যায়বিচার ব্যবস্থার একটি অংশকে স্বীকৃতি দেওয়া।

শিক্ষার পদ্ধতি: মুখস্থনির্ভরতার ফাঁদ

বেসরকারি অনেক আইন কলেজে এখনও পড়ানো হয় পুরনো ধাঁচে- আইন মুখস্থ করো, পরীক্ষায় লেখো, পাস করো। অথচ আধুনিক আইন শিক্ষার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত কেস স্টাডি বিশ্লেষণ, মক ট্রায়াল, লিগ্যাল রিসার্চ, যুক্তিভিত্তিক বিতর্ক। এই পদ্ধতিগুলো ছাড়া আইন শিক্ষা কাগুজে ডিগ্রিতে পরিণত হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য- অনেক শিক্ষার্থী এলএলবি শেষ করেও একটি সাধারণ মামলা পড়ে বুঝতে পারেন না।

আইন কলেজের প্রাণ হলো শিক্ষক। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে অনেক বেসরকারি আইন কলেজে পর্যাপ্ত যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষক নেই। খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে কোনোভাবে ক্লাস চালানো হয়। গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ সীমিত। এতে শিক্ষকরাও অনুপ্রাণিত হন না, আর শিক্ষার্থীরাও মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হন।

আইন শিক্ষার জন্য দরকার সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, আপডেটেড আইন বই, জার্নাল ও অনলাইন ডেটাবেস। কিন্তু অনেক কলেজে লাইব্রেরি নামমাত্র। ইন্টারনেট সুবিধা সীমিত, গবেষণার পরিবেশ অনুপস্থিত। আদালত পরিদর্শন, ইন্টার্নশিপ বা ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ অনেক ক্ষেত্রে কেবল কাগজে-কলমে।

মনিটরিং মানে শুধু পরিদর্শন নয়; মান নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি ও উন্নয়নের দিকনির্দেশনা। বেসরকারি আইন কলেজগুলোর ক্ষেত্রে মনিটরিং জরুরি কয়েকটি কারণে। শিক্ষার মান রক্ষা,  অযোগ্য প্রতিষ্ঠানের বিস্তার রোধ,  শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ সুরক্ষা, আইন পেশার মর্যাদা রক্ষা, মনিটরিং না থাকলে আইন শিক্ষা ব্যবসায় পরিণত হয় যেখানে ভর্তি মানেই আয়, আর শিক্ষার মান গৌণ।

আইন শিক্ষার ক্ষেত্রে একাধিক সংস্থার ভূমিকা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার মান দেখার দায়িত্ব থাকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন-এর, আর পেশাগত মান ও আইনজীবী হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণ করে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। কিন্তু বাস্তবে এই দুই সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

অনুমোদন দেওয়ার পর নিয়মিত ও কঠোর তদারকি না হলে অনেক প্রতিষ্ঠান শর্ত মানে না। কাগজে-কলমে সব ঠিক থাকলেও বাস্তবে শিক্ষার মান নি¤œমুখী থাকে।

একজন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সময় কলেজের বাহারি বিজ্ঞাপন দেখে সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু কয়েক বছর পর বুঝতে পারেন- প্রতিশ্রæতি আর বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক। তখন কিছু করার থাকে না। ডিগ্রি হাতে পেলেও পেশাগত দক্ষতার ঘাটতি থেকে যায়। এই অসহায়ত্ব রাষ্ট্রের জন্যও লজ্জাজনক।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ জরুরি হলো বেসরকারি আইন কলেজে নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শন, শিক্ষক নিয়োগে ন্যূনতম যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক, লাইব্রেরি ও গবেষণা সুবিধার মান নির্ধারণ, মক ট্রায়াল ও ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা, মান না মানলে ভর্তি বন্ধ বা অনুমোদন বাতিলের দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত মনিটরিং হতে হবে কেবল শাস্তিমূলক নয়, গঠনমূলক- যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো মান উন্নয়নে উৎসাহ পায়।

যে আইন কলেজ থেকে অদক্ষ আইনজীবী বের হয়, সেই আইনজীবী আদালতে গিয়ে বিচার প্রক্রিয়াকে ধীর করে, মামলার জট বাড়ায়। ফলে ভোগান্তি বাড়ে সাধারণ মানুষের। তাই আইন কলেজের মানহীনতা কেবল শিক্ষাক্ষেত্রের সমস্যা নয়; এটি সরাসরি বিচার ব্যবস্থার সংকট।

বাংলাদেশে বেসরকারি আইন কলেজের সংখ্যা নয়, মান এখন মূল প্রশ্ন। আইন শিক্ষা দুর্বল হলে ন্যায়বিচার দুর্বল হয়- এই সত্য উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাই এখনই সময়, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বিত ও কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করার। আইন কলেজ যেন ব্যবসা নয়, সত্যিকারের শিক্ষাকেন্দ্র হয়- এই প্রত্যাশাই আজ সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি।

কারণ আইনের শিক্ষায় শৈথিল্য মানেই ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থায় শৈথিল্য। এই ঝুঁকি নেওয়ার অধিকার আমাদের নেই। 

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর