Logo

আইন ও বিচার

বাড়ছে তালাক, ভাঙনের ভারে অনিশ্চয়তায় শিশু

Icon

সোহানা ইয়াসমিন

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:২৭

বাড়ছে তালাক, ভাঙনের ভারে অনিশ্চয়তায় শিশু

রাজধানী আজ শুধু যানজট, দূষণ আর দালানের শহর নয়- এ শহর ক্রমেই হয়ে উঠছে ভাঙা সংসারের নগরী। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও পারিবারিক আদালতের নথি বলছে, রাজধানী ঢাকা-তে তালাকের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো- এই তালাকের বড় অংশই দিচ্ছেন নারীরা। একসময় তালাক ছিল সামাজিকভাবে লজ্জার, গোপনের বিষয়; আজ তা প্রকাশ্য বাস্তবতা। কেন নারীরাই এগিয়ে আসছেন সংসার ভাঙার সিদ্ধান্তে? আর এই ভাঙনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী কারা? উত্তর একটাই- নিরাপত্তাহীন শিশুরা।

শহুরে জীবনে পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়েছে বহুদিন। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারে রূপান্তর, কর্মব্যস্ততা, আর্থিক চাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব- সব মিলিয়ে দাম্পত্য সম্পর্কে বাড়ছে দূরত্ব। আগে যে সমস্যাগুলো পরিবার বা সমাজ সামাল দিত, এখন সেগুলো গিয়ে ঠেকছে আদালতের দরজায়। তালাক যেন শেষ বিকল্প নয়, বরং দ্রুত নেওয়া সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরিবর্তনের কথা স্বীকার করতেই হবে। নারীরা আগের চেয়ে শিক্ষিত, সচেতন এবং আইন সম্পর্কে অবগত। নির্যাতন, অবহেলা, অর্থনৈতিক বঞ্চনা কিংবা দাম্পত্য অসন্তোষ- এসব সহ্য করে আজীবন থেকে যাওয়ার মানসিকতা বদলেছে। কর্মজীবী নারীরা আর্থিকভাবে কিছুটা স্বাবলম্বী হওয়ায় তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহস পাচ্ছেন। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্নও উঠছে- এই সাহস কি সব ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্তে রূপ নিচ্ছে? নাকি পারিবারিক সমঝোতার পথ আগেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে?

তালাকের পেছনে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক কলহ, সন্দেহ, পরকীয়ার অভিযোগ, মাদকাসক্তি, আর্থিক অস্বচ্ছতা ও শ্বশুরবাড়ির নির্যাতন। অনেক ক্ষেত্রে যৌতুকের চাপ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে দাম্পত্য ভাঙনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও তুচ্ছ বিষয় নিয়েও দাম্পত্য সম্পর্ক চরম পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে- কারণ আলোচনার সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে।

তালাকের কাগজে স্বাক্ষর দেন স্বামী-স্ত্রী; কিন্তু এর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত বহন করে শিশুরা। ভাঙা পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, মানসিক আঘাত পায়, পড়াশোনায় মনোযোগ হারায়। বাবা-মায়ের দ্বন্দ্বে তারা হয়ে ওঠে অনিচ্ছাকৃত সাক্ষী। অনেক সময় অভিভাবকের রাগ-ক্ষোভ গিয়ে পড়ে সন্তানের ওপর। শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক বিকাশ ও ভবিষ্যৎ ব্যক্তিত্ব- সবই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

ভরণপোষণ ও অভিভাবকত্বের জটিলতা

তালাকের পর শুরু হয় আরেক যুদ্ধ-ভরণপোষণ ও সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে। আদালতে বছরের পর বছর মামলা চলে, কিন্তু বাস্তবে ভরণপোষণের অর্থ সময়মতো পাওয়া যায় না। অনেক মা একাই সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব কাঁধে নেন, অথচ অর্থনৈতিক সহযোগিতা অনিয়মিত বা অনুপস্থিত থাকে। আবার কোথাও কোথাও ভরণপোষণকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়- যা শিশুর স্বার্থের পরিপন্থী।

যৌতুক মামলা ও পারিবারিক মামলা: সংখ্যার চাপ

পারিবারিক আদালতগুলোতে যৌতুক, নির্যাতন, ভরণপোষণ ও তালাক সংক্রান্ত মামলার পাহাড় জমছে। একটি মামলার নিষ্পত্তিতে সময় লাগে দীর্ঘদিন। এতে একদিকে যেমন বিচারপ্রার্থীরা মানসিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, অন্যদিকে আদালতের ওপরও বাড়ে চাপ। প্রশ্ন হলো- এই মামলা বৃদ্ধিই কি সমস্যার সমাধান, নাকি সমস্যার গভীরতাই প্রকাশ করছে?

আইন তালাক, ভরণপোষণ ও সন্তানের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বললেও বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি রয়ে গেছে। আইনি লড়াই দীর্ঘ হলে সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়, সমঝোতার পথ বন্ধ হয়। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক বিরোধ মীমাংসার বিকল্প ব্যবস্থা-মধ্যস্থতা, কাউন্সেলিং কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয় না। অথচ উন্নত সমাজগুলোতে বিচ্ছেদের আগে সমঝোতা ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা বাধ্যতামূলক করা হয়।

তালাক কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি সামাজিক কাঠামোর প্রতিফলন। পরিবার ভাঙলে সমাজ দুর্বল হয়। শিশুরা যখন স্থিতিশীল পরিবার পায় না, তখন ভবিষ্যতে অপরাধ, হতাশা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি বাড়ে। তাই এই সংকটকে কেবল নারী-পুরুষের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক সমস্যা।

নারীর তালাক দেওয়ার অধিকার অবশ্যই মৌলিক মানবাধিকার। কিন্তু ক্ষমতায়নের অর্থ সম্পর্ক ভাঙার উৎসাহ নয়; বরং ন্যায়ভিত্তিক, সম্মানজনক ও নিরাপদ দাম্পত্য নিশ্চিত করা। সমাজকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে নারী নির্যাতনের শিকার হলে ন্যায় পাবে, আবার অপ্রয়োজনীয় ভাঙন এড়ানোর সুযোগও থাকবে।

প্রথমত, বিয়ের আগে ও পরে পারিবারিক কাউন্সেলিং চালু করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, পারিবারিক আদালতে মামলা করার আগে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যকর করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, ভরণপোষণ আদায়ের প্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে। চতুর্থত, শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য আলাদা সহায়তা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সর্বোপরি, পরিবারকে কেন্দ্র করে সামাজিক মূল্যবোধ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে।

রাজধানীতে তালাক বৃদ্ধির প্রবণতা আমাদের সামনে এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। এটি নারীর সচেতনতার ইতিবাচক দিক যেমন দেখায়, তেমনি পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতাও প্রকাশ করে। কিন্তু যে কোনো বিচ্ছেদের চূড়ান্ত মূল্য দিচ্ছে শিশুরা- যারা কোনো সিদ্ধান্তের অংশ ছিল না। তাই তালাকের সংখ্যাকে শুধু পরিসংখ্যান হিসেবে না দেখে, এর সামাজিক ও মানবিক প্রভাব গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। পরিবারকে বাঁচাতে হলে চাই আইন, সমাজ ও নৈতিকতার সম্মিলিত উদ্যোগ। নইলে রাজধানীর আকাশচুম্বী ভবনের ছায়ায় বেড়ে উঠবে এক প্রজন্ম- যাদের শৈশব কেটেছে ভাঙা সংসারের ভার নিয়ে। 

বিকেপি/এমএম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর