ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আইন সম্মত
মাসুম আহম্মেদ
প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৪৫
ধর্ম মানুষের বিশ্বাসের বিষয় আর রাজনীতি হলো ক্ষমতার প্রশ্ন। এই দুইয়ের সংমিশ্রণ ইতিহাসে কখনোই শুভ ফল বয়ে আনেনি। বরং ধর্মের নামে রাজনীতি সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করেছে, সহিংসতা উসকে দিয়েছে এবং রাষ্ট্রকে ঠেলে দিয়েছে অস্থিতিশীলতার পথে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আইনসম্মত কিনা এ বিষয়ে আজ আমরা সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব।
বাংলাদেশ একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের ভিত্তি কোনো বিশেষ ধর্ম নয়, বরং সংবিধানপ্রদত্ত সমতা, নাগরিক অধিকার ও আইনের শাসন। সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষতা নিশ্চিত করবে এবং ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। এই ঘোষণার অর্থ পরিষ্কার: ধর্ম থাকবে ব্যক্তির বিশ্বাসের জগতে, আর রাজনীতি চলবে রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গনে।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ- এ কথা শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, এটি আইনগত বাস্তবতাও। দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি, পুলিশ আইন এবং স্থানীয় প্রশাসনের বিধিমালায় জনসমাগমস্থলে উসকানিমূলক বক্তব্য, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কিংবা অনুমতিবিহীন রাজনৈতিক সভা দমনের ক্ষমতা প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যেহেতু সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থান, সেহেতু সেখানে রাজনৈতিক সমাবেশ বা দলীয় প্রচারণা আইনত প্রশ্নবিদ্ধ।
কিন্তু বাস্তবতা হলো আইন থাকলেও তার প্রয়োগ দুর্বল। কখনো সামাজিক সংবেদনশীলতার অজুহাতে, কখনো রাজনৈতিক চাপের কারণে প্রশাসন দৃঢ় অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়। এর ফলেই ধর্মীয় মঞ্চে রাজনৈতিক বক্তব্য ধীরে ধীরে স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হতে শুরু করে- যা রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক সংকেত।
একটি মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা প্যাগোডা কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। এগুলো সব নাগরিকের। সেখানে একজন নাগরিক যখন উপাসনার জন্য প্রবেশ করেন, তখন তিনি দলীয় পরিচয় নয়, নাগরিক ও বিশ্বাসী হিসেবে উপস্থিত থাকেন। সেই পবিত্র স্থানে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে বক্তব্য দেওয়া মানে ভিন্নমতের মানুষকে পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করা। এটি নাগরিক সমতার ধারণার পরিপন্থী।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনীতি ঢুকে পড়লে ধর্ম আর ঐক্যের শক্তি থাকে না; তা হয়ে ওঠে বিভাজনের অস্ত্র। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ধর্মের মঞ্চকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানালে শেষ পর্যন্ত ধর্মই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ কথা স্পষ্ট যে, রাজনীতি ধর্মকে ব্যবহার করে, ধর্ম রাজনীতিকে নয়। রাজনীতি স্বভাবতই প্রতিযোগিতামূলক। ক্ষমতার লড়াইয়ে রাজনীতির ভাষা কঠোর, কখনো আক্রমণাত্মক। সেই ভাষা যখন ধর্মীয় মঞ্চে উঠে আসে, তখন ধর্মের সহনশীলতা ও শান্তির বাণী চাপা পড়ে যায়। ধর্ম তখন আর নৈতিকতার আশ্রয়স্থল থাকে না- পরিণত হয় রাজনৈতিক প্রচারণার প্ল্যাটফর্মে। এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্রকে স্পষ্ট করে বলতে হবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনীতির কোনো স্থান নেই। ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে আইনের প্রয়োগে শৈথিল্য দেখানো মানে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের বীজ বপন করা।
এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা চাইলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করতে পারে, মামলা নিতে পারে, প্রয়োজনে আয়োজকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এক পক্ষের ক্ষেত্রে কঠোরতা, অন্য পক্ষের ক্ষেত্রে নীরবতা। এই দ্বৈত নীতি আইনের শাসনকে দুর্বল করে।
আইনের চোখে সবাই সমান- এই নীতি যদি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও প্রযোজ্য না হয়, তবে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবেই।
ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ধর্মীয় মঞ্চে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে তারা হয়তো সাময়িক জনপ্রিয়তা পান, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এতে ধর্মেরই ক্ষতি হয়। ধর্মীয় নেতা মানেই সমাজের কাছে নৈতিক পথপ্রদর্শক। সেই পথপ্রদর্শক যদি রাজনীতির ভাষায় কথা বলেন, তবে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়, ধর্ম ও রাজনীতির সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়।
ধর্মীয় নেতাদের মনে রাখতে হবে ‘ধর্মের শক্তি তার নৈতিকতায়, রাজনীতিতে নয়।’
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনীতি নিষিদ্ধ রাখার দাবি মানে ধর্মচর্চা সীমিত করা নয়। বরং এটি ধর্ম ও গণতন্ত্র- উভয়কেই রক্ষা করার প্রয়াস। গণতন্ত্র চায় মুক্ত মতপ্রকাশ, কিন্তু সেই মতপ্রকাশেরও নির্দিষ্ট ক্ষেত্র আছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সেই ক্ষেত্র নয়।
রাজনৈতিক বক্তব্যের জন্য ময়দান আছে, সভা আছে, মিডিয়া আছে। ধর্মীয় মঞ্চে সেই বক্তব্য চাপিয়ে দেওয়া মানে ধর্মচর্চার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রাখতে হবে এবং তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এটি কোনো দলীয় প্রশ্ন নয়, এটি রাষ্ট্রের স্বার্থের প্রশ্ন। আইন আছে কিন্তু আইনকে কার্যকর করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা দরকার। ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্বশীলতা দরকার। আর নাগরিক সমাজের সচেতন চাপ দরকার।
ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার বানালে রাজনীতি লাভবান হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধর্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমাজ বিভক্ত হয়। ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষা বহুবার দিয়েছে।
ধর্ম থাকবে বিশ্বাসের জায়গায়। রাজনীতি চলবে রাজনীতির ময়দানে। এই সীমারেখা রক্ষা করা কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়, এটি রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান। এই সত্য উচ্চস্বরে বলা জরুরি “ধর্মের মঞ্চে রাজনীতি নয়।”
বিকেপি/এমএম

