Logo

আইন ও বিচার

স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি আইনে রাষ্ট্রদ্রোহ না মতপ্রকাশ?

Icon

সোহানা ইয়াসমিন

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৪৯

স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি আইনে রাষ্ট্রদ্রোহ না মতপ্রকাশ?

একটি জাতির ইতিহাস তার অস্তিত্বের ভিত্তি। সেই ইতিহাসে আঘাত মানে জাতির আত্মপরিচয়ে আঘাত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ঘটনা নয়, এটি লাখো শহীদের রক্তে লেখা একটি রাষ্ট্রের জন্মকথা। অথচ দুঃখজনকভাবে স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও আমরা প্রত্যক্ষ করছি পরিকল্পিত ইতিহাস বিকৃতি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর ধারাবাহিক আঘাত। দেশের আইনে এর শাস্তি কী? সংবিধান কি এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা দিয়েছে?

বাংলাদেশ-এর সংবিধান কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার দলিল নয়; এটি স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনৈতিক-নৈতিক ঘোষণাপত্র। সংবিধানের প্রস্তাবনায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই রাষ্ট্র জনগণের আত্মত্যাগের ফল।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ ঘোষণা করে- সংবিধানই প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন। এর অর্থ, স্বাধীনতার ভিত্তি অস্বীকার বা বিকৃত করা সংবিধানিক কাঠামোর বিরুদ্ধাচরণ।

অনুচ্ছেদ ৮-এ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হয়েছে। এই জাতীয়তাবাদের মূলেই রয়েছে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধ অস্বীকার বা বিকৃতি রাষ্ট্রের মৌলিক দর্শনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার শামিল।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো অনুচ্ছেদ ২১, যেখানে বলা হয়েছে, সংবিধান ও আইনের প্রতি আনুগত্য প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য। ইতিহাস বিকৃতি যদি সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী হয়, তবে তা নাগরিক কর্তব্য লঙ্ঘনেরও শামিল।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি সরাসরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিভিন্ন আইনে প্রতিফলিত হয়েছে। দণ্ডবিধির আওতায় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, রাষ্ট্রদ্রোহমূলক বক্তব্য এবং জনগণের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়ানোর অপরাধে শাস্তির বিধান রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ অস্বীকার বা শহীদদের সংখ্যা নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তি ছড়ানো এসব আইনের ধারার আওতায় পড়তে পারে।

এছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (বর্তমানে সংশোধিত কাঠামোসহ) রাষ্ট্রের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতা ও জাতীয় প্রতীক নিয়ে অপপ্রচারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। অনলাইনে ইতিহাস বিকৃতি করে রাষ্ট্রবিরোধী বিভ্রান্তি ছড়ালে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস মানেই ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং এর নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিত্ব। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-কে স্বাধীনতার ঘোষক ও জাতির পিতা হিসেবে সংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাঁকে ঘিরে ইতিহাস বিকৃতি শুধু ব্যক্তি অবমাননা নয়, এটি রাষ্ট্রের জন্মকথাকে অস্বীকার করার সমান।

এ কারণেই জাতির পিতাকে নিয়ে কটূক্তি, বিকৃত তথ্য প্রচার বা তাঁর ভূমিকা অস্বীকারের বিরুদ্ধে আলাদা আইন ও বিশেষ শাস্তির বিধান করা হয়েছে। এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমা অতিক্রম করে রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তিতে আঘাত হানার শামিল।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৯ নাগরিককে বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার দিয়েছে। তবে একই অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে- রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে এই স্বাধীনতার ওপর যুক্তিসংগত সীমাবদ্ধতা আরোপ করা যাবে।

ইতিহাস বিকৃতি যদি মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে, শহীদদের আত্মত্যাগকে তুচ্ছ করে, স্বাধীনতা সংগ্রামকে ভিন্ন রাষ্ট্রের ‘ষড়যন্ত্র’ বলে উপস্থাপন করে। তাহলে তা মতপ্রকাশ নয়, বরং সাংবিধানিক মূল্যবোধবিরোধী অপপ্রচার।

দেশের উচ্চ আদালত একাধিক রায়ে স্পষ্ট করেছে- মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস প্রশ্নাতীত। আদালতের ভাষায়, এটি “রাষ্ট্রের আত্মা”। এই আত্মাকে অস্বীকার করার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই।

আদালত আরও বলেছেন, ইতিহাস বিকৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করে এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে শূন্য সহনশীলতা দেখানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

ইতিহাস বিকৃতি কেবল অতীত নিয়ে বিতর্ক নয়; এটি ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের একটি কৌশল। যে জাতি তার জন্মকথা ভুলে যায়, সে জাতি সহজেই বিভ্রান্ত হয়, বিভক্ত হয় এবং পরাধীনতার দিকে ধাবিত হয়।

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম যখন বিভ্রান্তিকর তথ্যের মুখোমুখি হয়, তখন তাদের জাতীয় চেতনা দুর্বল হয়ে পড়ে। এটি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি।

তাই আইন প্রয়োগে আপসহীনতা। ইতিহাস বিকৃতিকারী যে-ই হোক, তার পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচ্য হতে পারে না।

শিক্ষাব্যবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আরও গভীর, তথ্যভিত্তিক ও গবেষণানির্ভরভাবে উপস্থাপন করা। গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি জরুরি সামাজিক ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সচেতন নজরদারি এবং দ্রুত প্রতিকার।

স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি কোনো সাধারণ মতভেদ নয়; এটি সংবিধান, রাষ্ট্র ও জাতির বিরুদ্ধে অবস্থান। বাংলাদেশের সংবিধান এ বিষয়ে নীরব নয়- বরং সুস্পষ্টভাবে স্বাধীনতার চেতনা রক্ষার নির্দেশনা দেয়।

মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নাতীত। শহীদদের আত্মত্যাগ বিতর্কের বিষয় হতে পারে না। ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগই পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সত্যভিত্তিক, আত্মমর্যাদাশীল জাতিসত্তা উপহার দিতে।

রাষ্ট্র যদি তার জন্মকথা রক্ষা করতে না পারে, তবে সে রাষ্ট্র নিজেকেই রক্ষা করতে পারবে না- এই সত্য উপলব্ধির এখনই সময়। 

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর