সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক
রাজনৈতিক নিয়োগ কতটা বৈধ?
মাসুম আহম্মেদ
প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৪৬
গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ স্থানীয় সরকার। সংবিধান স্বীকৃত এই ব্যবস্থার মূল শক্তি জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। অথচ বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, এবং এসব নিয়োগ ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি বারবার সামনে আসছে, বিদ্যমান আইনে সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক কি রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ দেওয়া যায়? এই প্রশ্ন কেবল প্রশাসনিক নয়; এটি সাংবিধানিক চেতনা, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক নৈতিকতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
স্থানীয় সরকার ও সংবিধানের দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালনার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। এখানে ‘নির্বাচিত ব্যক্তি’ শব্দ দুটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সংবিধানপ্রণেতাদের উদ্দেশ্য ছিল- স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষমতা যেন জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতেই ন্যস্ত থাকে, আমলাতান্ত্রিক বা রাজনৈতিক নিয়োগের মাধ্যমে নয়।
সংবিধানের এই মৌলিক দর্শনের সঙ্গে সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নিয়োগের প্রশ্নটি সরাসরি সাংঘর্ষিক না হলেও, এটি একটি ব্যতিক্রমী ও অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবেই বিবেচিত হওয়ার কথা।
সিটি কর্পোরেশন আইন কী বলে? :
বাংলাদেশে সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত হয় সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন আইন দ্বারা- যেমন স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯। এই আইনে নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের মাধ্যমেই সিটি কর্পোরেশন পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। তবে আইনের একটি বিশেষ ধারায় বলা আছে, কোনো কারণে নির্বাচিত পরিষদ কার্যকর না থাকলে বা বিলুপ্ত হলে সরকার অন্তর্র্বতীকালীন প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারে।
এখানেই মূল বিতর্কের সূত্রপাত। আইনে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হলেও, কোথাও স্পষ্ট করে বলা নেই যে এই প্রশাসক রাজনৈতিক ব্যক্তি হবেন, কিংবা কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া যাবে। আইন নীরব, কিন্তু সেই নীরবতার সুযোগ কি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে?
প্রশাসক নিয়োগ: প্রশাসনিক না রাজনৈতিক পদ?
আইন ও প্রশাসনিক নীতির সাধারণ নীতি হলোপ্রশাসক একটি প্রশাসনিক পদ, রাজনৈতিক নয়। প্রশাসকের মূল দায়িত্ব হচ্ছে দৈনন্দিন কার্যক্রম সচল রাখা, নাগরিক সেবা অব্যাহত রাখা এবং নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা। প্রশাসক কোনো নীতিনির্ধারক বা রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নকারী হবেন, এমনটি আইন কোথাও অনুমোদন দেয় না। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। দেখা যাচ্ছে, প্রশাসক হিসেবে অনেক সময় এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যাঁরা সরাসরি কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত, কিংবা অতীতে দলীয় পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে- এটি কি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার লঙ্ঘন নয়?
রাজনৈতিক নিয়োগের ঝুঁকি : সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক যদি রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হন, তাহলে তার প্রভাব পড়ে- নাগরিক সেবার নিরপেক্ষতায়, উন্নয়ন প্রকল্প বণ্টনে,স্থানীয় রাজনীতিতে প্রশাসনের ভূমিকার ওপর, নির্বাচনের সমতাভিত্তিক পরিবেশে বিশেষ করে নির্বাচন-পূর্ব সময়ে রাজনৈতিক পরিচয়সম্পন্ন প্রশাসক নিয়োগ করা হলে, সেটি নির্বাচনের মাঠকে অসম করে তুলতে পারে- যা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।
সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। কিন্তু প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সরাসরি কোনো ভূমিকা নেই। এই শূন্যতাই সমস্যার মূল। কারণ প্রশাসক নিয়োগ পুরোপুরি নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠে- যদি নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বে থাকে, তবে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নিয়োগে কমিশনের মতামত বা সম্মতি প্রয়োজন হওয়া উচিত কি না?
দেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক চর্চার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে বারবার উঠে এসেছে- নির্বাচনের বিকল্প হিসেবে প্রশাসক ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। এটি কেবল অস্থায়ী ও অনিবার্য পরিস্থিতির জন্য।
যদি প্রশাসক নিয়োগ দীর্ঘদিন বহাল থাকে, কিংবা রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে সেটি সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী হয়ে ওঠে।
অনেকেই প্রশ্ন তোলেন আইনে কি রাজনৈতিকভাবে প্রশাসক নিয়োগের অনুমতি আছে? সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, স্পষ্ট অনুমতি নেই।
আইন প্রশাসক নিয়োগের কথা বলেছে, কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনার কথা বলেনি। আইনের নীরবতাকে রাজনৈতিক লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হলে, সেটি আইনপ্রণেতার উদ্দেশ্যের অপব্যবহার বলেই বিবেচিত হবে।
আইনের ব্যাখ্যার একটি স্বীকৃত নীতি হলো যেখানে আইন কোনো ক্ষমতা দেয়, সেখানে সেই ক্ষমতা যৌক্তিক, ন্যায্য ও উদ্দেশ্যসম্মতভাবে প্রয়োগ করতে হবে। তবে এখানে রাজনৈতিক পক্ষপাত সেই নীতির পরিপন্থী।
প্রশাসক নিয়োগের প্রশ্নে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ যদি প্রাধান্য পায়, তবে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কার্যত আমলাতান্ত্রিক-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এতে জনগণের ভোটাধিকার অর্থহীন হয়ে পড়ে। স্থানীয় সরকার তখন আর জনগণের সরকার থাকে না, হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সম্প্রসারিত হাত। এটি শুধু একটি আইনি সমস্যা নয়; এটি একটি নৈতিক সংকট।
এই সংকট থেকে উত্তরণে কয়েকটি বিষয় জরুরি- ১. আইনে স্পষ্টতা আনা: সিটি কর্পোরেশন আইনে প্রশাসক নিয়োগের যোগ্যতা, নিরপেক্ষতা ও সময়সীমা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। ১. রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বাধ্যতামূলক করা। প্রশাসক হিসেবে কেবল অবসরপ্রাপ্ত বা নিরপেক্ষ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগের বিধান থাকা প্রয়োজন। ৩. নির্বাচনকালীন সীমাবদ্ধতা। নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়ে প্রশাসকের ক্ষমতা সীমিত করার বিধান প্রণয়ন করা উচিত। ৪. নির্বাচন কমিশনের পরামর্শ গ্রহণ। প্রশাসক নিয়োগে নির্বাচন কমিশনের মতামত নেওয়ার সাংবিধানিক বা আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরি করা যেতে পারে।
সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ একটি প্রয়োজনীয় কিন্তু ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা। এটিকে নিয়মে পরিণত করা কিংবা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা সংবিধানসম্মত নয়। আইন যেখানে নীরব, সেখানে নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক চেতনা পথ দেখাবে- এটাই প্রত্যাশা।
স্থানীয় সরকার শক্তিশালী না হলে রাষ্ট্রও শক্তিশালী হয় না। আর স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হলে প্রশাসকের চেয়ার নয়, ভোটের বাক্সকেই কেন্দ্রে রাখতে হবে। রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসক নয়- জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিই হতে হবে নগর শাসনের মূল চালিকাশক্তি।
বিকেপি/এমএম

