রাষ্ট্রের চাকরিজীবীরা তাঁদের কর্মজীবনের শেষপ্রান্তে এসে যে সামাজিক নিরাপত্তার ওপর ভরসা করেন, তার নাম পেনশন। এটি কোনো দান নয়, বরং দীর্ঘদিনের সেবার বিনিময়ে অর্জিত আইনগত অধিকার। সংবিধান, বিধিমালা ও সরকারি নীতিতে পেনশনকে সুরক্ষিত অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র হতাশাজনক। সরকারি চাকরিজীবী অবসর গ্রহণের পর পেনশন পেতে গিয়ে আজও চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
দেশের বিদ্যমান আইন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীর পেনশন একটি আইনগত অধিকার। সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে। সেই আলোকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পেনশন ব্যবস্থা প্রবর্তিত। পেনশন সংক্রান্ত বিধানাবলি যেমন- সরকারি কর্মচারী (পেনশন) বিধিমালা স্পষ্টভাবে বলে, নির্দিষ্ট মেয়াদ পূর্ণ করলেই কর্মচারী পেনশন পাওয়ার অধিকারী।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অবসর গ্রহণের পর একজন কর্মচারীকে বছরের পর বছর ঘুরতে হয় হিসাব অফিস, দপ্তর, ব্যাংক ও মন্ত্রণালয়ের দ্বারে দ্বারে। কোথাও কাগজপত্র আটকে থাকে, কোথাও স্বাক্ষরের অপেক্ষা, কোথাও আবার “ফাইল নড়ছে না”-এই অদৃশ্য অজুহাত।
ভোগান্তির বাস্তব চিত্র:
আজও অসংখ্য অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী অভিযোগ করেন অবসরোত্তর পেনশন () পেতে দীর্ঘসূত্রতা, গ্র্যাচুইটি ও আনুতোষিকের টাকা আটকে থাকা, হিসাব নিরীক্ষা (অডিট) আপত্তির নামে ফাইল স্থগিত Pension Payment Order–PPO, ব্যাংকে হিসাব খোলার জটিলতা, ডিজিটাল সিস্টেম চালু হলেও ম্যানুয়াল জটিলতা বহাল।
একজন কর্মচারী যিনি জীবনের সেরা সময় রাষ্ট্রকে দিয়েছেন, অবসরের পর তাঁকে যদি মৌলিক প্রাপ্য অর্থের জন্য অপমানজনক দৌড়ঝাঁপ করতে হয়, তবে সেটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়- আইনেরও ব্যর্থ প্রয়োগ।
বর্তমান আইন অনুযায়ী, অবসর গ্রহণের তারিখ থেকেই পেনশন কার্যকর হওয়ার কথা। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট দপ্তর বাধ্য যে অবসরের আগেই পেনশন কাগজপত্র প্রস্তুত করবে। ইচ্ছাকৃত বিলম্ব হলে তা দাপ্তরিক শৈথিল্য ও কর্তব্যে অবহেলা হিসেবে গণ্য। প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল ও উচ্চ আদালতে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়- এই আইনগুলো কার্যকর হচ্ছে কতটা?
পেনশন ভোগান্তির দায় একক কোনো পক্ষের নয়। দায় রয়েছে- সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রশাসনিক অদক্ষতা, হিসাব ও অডিট ব্যবস্থার অতিরিক্ত জটিলতা, দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, জবাবদিহির কার্যকর ব্যবস্থার অনুপস্থিতি।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন- যদি একজন চাকরিজীবী দায়িত্বে অবহেলা করলে বিভাগীয় শাস্তি হয়, তবে পেনশন ফাইল আটকে রেখে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে কষ্ট দিলে দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কেন নেওয়া হবে না?
সরকার সাম্প্রতিক ডিজিটাল পেনশন ব্যবস্থার কথা বলছে। অনলাইনে আবেদন, কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ, স্বয়ংক্রিয় হিসাব, সবই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে পুরোনো ম্যানুয়াল সংস্কৃতির সংঘর্ষ ঘটছে। ফলে অনলাইনে আবেদন হলেও কাগজপত্র জমা দিতে হচ্ছে হাতে হাতে। এক দপ্তরের তথ্য আরেক দপ্তর গ্রহণ করছে না।
প্রযুক্তিগত ত্রুটির দায় গিয়ে পড়ছে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তির ঘাড়ে। আইনের দৃষ্টিতে এটি অগ্রহণযোগ্য। কারণ রাষ্ট্র নিজেই যদি প্রযুক্তি চালু করে, তবে তার ত্রুটির দায় নাগরিকের ওপর চাপানো যায় না।
এই ভোগান্তি কমাতে আইন ও নীতিগতভাবে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন- ১. নির্দিষ্ট সময়সীমা আইন দ্বারা বাধ্যতামূলক করা। অবসর গ্রহণের সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে PPO ইস্যু ও পেনশন কার্যকর না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয় শাস্তির বিধান থাকা প্রয়োজন। ২. দায় নির্ধারণ ও শাস্তি নিশ্চিত করা। যে কর্মকর্তা বা দপ্তরের কারণে বিলম্ব হবে, তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ৩. প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে দ্রুত প্রতিকার ব্যবস্থা পেনশন সংক্রান্ত মামলাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির বিধান প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
৪. স্বতন্ত্র পেনশন ওমবাডসম্যান নিয়োগ। পেনশনভোগীদের অভিযোগ শুনতে ও দ্রুত সমাধান দিতে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান সময়ের দাবি। ৫. ডিজিটাল ব্যবস্থার পূর্ণ বাস্তবায়ন। ম্যানুয়াল ও ডিজিটালের দ্বৈততা বন্ধ করে একক, সহজ ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
পেনশন কেবল আর্থিক বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার আস্থার প্রতীক। যে রাষ্ট্র তার অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের সম্মান ও নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, সেখানে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সরকারি চাকরির প্রতি আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, আজকের অবসরপ্রাপ্তরাই গতকালের রাষ্ট্রযন্ত্রের চালক ছিলেন। তাঁদের সম্মান রক্ষা করা মানে রাষ্ট্রের নিজের মর্যাদা রক্ষা করা।
আইন আছে, নীতিমালা আছে, সদিচ্ছার কথাও বলা হচ্ছে তবু যদি ভোগান্তি কমে না, তবে ধরে নিতে হবে প্রয়োগে ঘাটতি রয়ে গেছে। পেনশন যেন ভিক্ষা না হয়ে দাঁড়ায়, সে জন্য এখনই কঠোর আইনগত ও প্রশাসনিক সংস্কার প্রয়োজন। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীর শেষ জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে বিলম্ব মানেই অন্যায়, যার কোনো যুক্তি নেই, কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।
বিকেপি/এমএম

