ছুটি শেষে না ফেরা পুলিশ সদস্য : আইনে কী পরিণতি?
বায়েজিদ তাশরীক
প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:০০
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের দায়িত্ব শুধু চাকরির নয়, এটি একটি শপথ, একটি আস্থার সম্পর্ক। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে পুলিশের চাকরিতে ছুটি নেওয়ার পর দীর্ঘদিন যোগদান না করলে আইনে কী হয়? আর চাকরি ছেড়ে পালিয়ে গেলে কোনো শাস্তি আছে কি?
এই প্রশ্ন শুধু একজন সদস্যের ব্যক্তিগত আচরণ নয়; এটি বাহিনীর শৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা ও আইনের শাসনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
পুলিশ বাহিনী কোনো সাধারণ সরকারি চাকরি নয়। এখানে কর্মরত প্রত্যেক সদস্য বিশেষ আইন, বিধি ও শৃঙ্খলাবিধির অধীনে আবদ্ধ। এখানে একজন পুলিশ সদস্যের অনুপস্থিতি কেবল দপ্তরের কাজ ব্যাহত করে না, অনেক ক্ষেত্রে তা সরাসরি জননিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করে।
বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনী পরিচালিত হয় মূলত Police Act, ১৮৬১, বাংলাদেশ পুলিশ রেগুলেশন (BPR) এবং সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালার মাধ্যমে। এসব আইনে ছুটি, অনুপস্থিতি ও পলায়নের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
আইন অনুযায়ী, কোনো পুলিশ সদস্য বৈধভাবে ছুটি নিয়ে নির্ধারিত সময় শেষে কর্মস্থলে যোগদান না করলে সেটিকে Unauthorized Absence বা অননুমোদিত অনুপস্থিতি হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রথম পর্যায়ে বিষয়টি দেখা হয় শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে। কিন্তু অনুপস্থিতির মেয়াদ যত দীর্ঘ হয়, অপরাধের মাত্রাও তত বাড়ে। সাধারণভাবে কয়েকদিন যোগদান না করলে কারণ দর্শানোর নোটিশ, দীর্ঘদিন (সাধারণত ৩০ দিনের বেশি) অনুপস্থিত থাকলে গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গ, কোনো যোগাযোগ না থাকলে পলায়ন বা চাকরি ত্যাগের ইঙ্গিত বহন করে।
পুলিশ বাহিনীতে ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “Desertion”- অর্থাৎ চাকরি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া। এটি কেবল চাকরিচ্যুতি নয়, বরং গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
বাংলাদেশ পুলিশ রেগুলেশন অনুযায়ী, কোনো পুলিশ সদস্য যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ও স্থায়ীভাবে দায়িত্ব ত্যাগ করেন, কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকেন, কিংবা চাকরিতে ফেরার কোনো আগ্রহ প্রকাশ না করেন, তাহলে তাঁকে পলাতক (Deserter) ঘোষণা করা যেতে পারে। এটি বাহিনীর দৃষ্টিতে সর্বোচ্চ মাত্রারশৃঙ্খলাভঙ্গ।
আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী পুলিশের চাকরি ছেড়ে পালানোর বা দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার শাস্তি হতে পারে- এক. চাকরিচ্যুতি (Dismissal), সবচেয়ে প্রচলিত শাস্তি। এতে ভবিষ্যতে সরকারি চাকরির সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। দুই. চাকরি হতে বরখাস্ত (Removal)
কিছু ক্ষেত্রে বরখাস্ত করা হয়, যা শাস্তির মাত্রায় চাকরিচ্যুতির কাছাকাছি। তিন. বিভাগীয় মামলা ও তদন্ত অনুপস্থিতির কারণ অনুসন্ধানে বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। চার. বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাজেয়াপ্ত, অনুপস্থিত সময়ের বেতন, ভাতা, এমনকি ভবিষ্যৎ সুবিধাও বাতিল হতে পারে। পাঁচ. ফৌজদারি জবাবদিহি (বিশেষ ক্ষেত্রে)। যদি অনুপস্থিতির সঙ্গে অস্ত্র, সরকারি সম্পদ বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি যুক্ত থাকে, তাহলে ফৌজদারি মামলার সুযোগও থাকে।
প্রশ্ন উঠতে পারে- একজন কর্মচারী চাকরি ছেড়ে গেলে এত কঠোরতা কেন? কারণ পুলিশ বাহিনী অস্ত্র বহন করে, রাষ্ট্রের গোপন ও সংবেদনশীল তথ্য জানে, জননিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, এমন কেউ হঠাৎ উধাও হয়ে গেলে তা শুধু প্রশাসনিক বিষয় থাকে না; এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে রূপ নিতে পারে।
আইন কঠোর হলেও মানবিকতার জায়গা পুরোপুরি অনুপস্থিত নয়। যদি কোনো পুলিশ সদস্য গুরুতর অসুস্থতা, পারিবারিক বিপর্যয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার বাস্তব কারণ প্রমাণসহ উপস্থাপন করতে পারেন, তাহলে কর্তৃপক্ষ শাস্তির মাত্রা লঘু করতে পারে। কিন্তু এখানে মূল শর্ত হলো যোগাযোগ ও সদিচ্ছা।
বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যরা ছুটি বাড়ানোর নিয়ম জানেন না কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে ব্যর্থ হন, ভয়ে বা ভুল বোঝাবুঝিতে আত্মগোপনে চলে যান।
এখানে প্রশাসনিক সচেতনতার ঘাটতি যেমন আছে, তেমনি দায়িত্বজ্ঞানহীনতার দায়ও এড়ানো যায় না।
বাংলাদেশ পুলিশ কেবল একটি বাহিনী নয়; এটি জনআস্থার প্রতীক। একজন সদস্যের অনিয়ম পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলে। তাই শৃঙ্খলা প্রশ্নে আপসের সুযোগ নেই।
কিন্তু শাস্তি দেওয়াই শেষ কথা নয়। শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজন স্পষ্ট ছুটি ব্যবস্থাপনা, সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা, মানসিক চাপ মোকাবিলায় সহায়তা,আইনি পরামর্শ ও সচেতনতা।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি বিষয় জরুরি- এক. ছুটি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, অর্থাৎ ছুটি বাড়ানো বা বিশেষ ছুটির নিয়ম সহজ ও স্পষ্ট করা। দুই. অনুপস্থিতির প্রাথমিক পর্যায়ে হস্তক্ষেপ, যা শুরুতেই যোগাযোগ ও সমাধানের চেষ্টা করা। তিন. শাস্তির পাশাপাশি পুনর্বাসন চিন্তা। সব ক্ষেত্রে চাকরিচ্যুতি নয়, পরিস্থিতি অনুযায়ী বিকল্প ব্যবস্থা। চার. সদস্যদের আইনগত সচেতনতা বৃদ্ধি। পালিয়ে গেলে কী পরিণতি এটি প্রশিক্ষণের অংশ হওয়া উচিত।
পুলিশের চাকরি কোনো সাধারণ পেশা নয়,- এটি দায়িত্ব, শৃঙ্খলা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের পরীক্ষা। ছুটি শেষে যোগদান না করা বা চাকরি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া আইনত গুরুতর অপরাধ এবং এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
আইন কঠোর বলেই বাহিনী শক্ত। তবে সেই কঠোরতার সঙ্গে মানবিক বোধ ও প্রশাসনিক দায়িত্বশীলতা যুক্ত না হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান আসে না। শৃঙ্খলা রক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি সচেতনতা ও সুবিচারও অপরিহার্য—এটাই আইনসম্মত ও রাষ্ট্রসম্মত পথ।
বিকেপি/এমএম

