পুলিশের আগের পোশাকে ফেরার দাবি নস্টালজিয়া না বাস্তব প্রয়োজন?
মাসুম আহম্মেদ
প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৫৩
রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠান পুলিশ। জনগণের চোখে পুলিশের প্রথম পরিচয় আসে তাদের আচরণে, দায়িত্ববোধে এবং অস্বীকার করার উপায় নেই তাদের পোশাকে। ইউনিফর্ম কেবল একটি কাপড় নয়; এটি শৃঙ্খলা, কর্তৃত্ব, আস্থা ও রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বের প্রতীক। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর বর্তমান পোশাক, বিশেষ করে নারী পুলিশের ইউনিফর্ম নিয়ে যে অসন্তোষ ও বিব্রতবোধ প্রকাশ পাচ্ছে, তা আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সম্প্রতি বিভিন্ন মহলে আবারও আলোচনায় এসেছে পুলিশের আগের ইউনিফর্মে ফিরে যাওয়ার দাবি। এই দাবি নিছক নান্দনিকতার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পেশাগত মর্যাদা, লিঙ্গ-সংবেদনশীলতা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তব কাজের সুবিধা-অসুবিধার মতো গুরুতর বিষয়।
বাংলাদেশ পুলিশের ইউনিফর্ম সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং কাজের সুবিধা বৃদ্ধি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বর্তমান পোশাক অনেক ক্ষেত্রেই সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারছে না। বিশেষ করে নারী পুলিশ সদস্যদের মধ্যে এই পোশাক নিয়ে ব্যাপক অস্বস্তি রয়েছে- যা প্রকাশ পাচ্ছে নীরবে, কখনো কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায়, আবার কখনো সহকর্মীদের আড্ডায়।
অনেক নারী পুলিশ সদস্যের অভিযোগ, বর্তমান ইউনিফর্মে তাদের পেশাগত পরিচয়ের চেয়ে বাহ্যিক রূপই বেশি দৃষ্টিগোচর হয়। কেউ কেউ বলছেন, এই পোশাকে তারা পুলিশের চেয়ে বাসা-বাড়ি বা অফিসের দারোয়ান কিংবা নিরাপত্তাকর্মীর মতো দেখায়- যা তাদের আত্মমর্যাদায় আঘাত হানে। এই অনুভূতি অবহেলা করার মতো নয়।
নারী পুলিশরা শুধু থানা বা ডেস্কে কাজ করেন না। তারা মাঠে নামেন, গ্রেপ্তার কার্যক্রমে অংশ নেন, ভিড় নিয়ন্ত্রণ করেন, আন্দোলন-সমাবেশ সামলান, রাতের ডিউটি করেন, কখনো কখনো দুর্গম এলাকায় অভিযানে যান। এমন বাস্তবতার সঙ্গে বর্তমান ইউনিফর্ম কতটা মানানসই- সে প্রশ্ন জোরালোভাবেই উঠছে।
অনেক নারী পুলিশ সদস্য বাংলাদেশের খবরকে বলেন- পোশাকের কাট, কাপড়ের মান ও নকশা তাদের চলাফেরা ও দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে। গরমে অস্বস্তি, চলাচলে অসুবিধা, সামাজিক দৃষ্টিকোণে অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য বা কটূক্তির শিকার হওয়ার আশঙ্কা- সব মিলিয়ে এই ইউনিফর্ম তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পোশাক নিয়ে বিব্রতবোধ পেশাগত আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলে। একজন পুলিশ সদস্য যদি নিজের পোশাক নিয়েই অস্বস্তিতে থাকেন, তাহলে কর্তৃত্বপূর্ণ ও দৃঢ় উপস্থিতি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। পুলিশের কাজের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় অন্তরায়।
পুলিশের ইউনিফর্ম এমন হওয়া উচিত, যা দেখামাত্রই মানুষের মনে শৃঙ্খলা ও আইনের প্রতীক হিসেবে গেঁথে যায়। আগের ইউনিফর্মে সেই দৃঢ়তা ও স্বতন্ত্রতা ছিল- এমন মত বহু অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তা ও সাধারণ নাগরিকের। বর্তমান পোশাকে সেই ঐতিহ্যবাহী পুলিশি উপস্থিতি অনেকটাই ম্লান হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন পুলিশ সদস্য যখন রাস্তায় দাঁড়ান, তখন তার পোশাকই প্রথমে কথা বলে। যদি সেই পোশাক সাধারণ নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে গুলিয়ে যায়, তাহলে কর্তৃত্বের প্রশ্নে দুর্বলতা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে এটি একটি গুরুতর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে নিঃসন্দেহে আধুনিকতা জরুরি। কিন্তু আধুনিকতার নামে যদি বাস্তবতা ও উপযোগিতা উপেক্ষিত হয়, তাহলে সেটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে পরিণত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পুলিশ বাহিনী আধুনিক ইউনিফর্ম ব্যবহার করে ঠিকই, কিন্তু সেসব পোশাক তৈরি হয় সংশ্লিষ্ট দেশের জলবায়ু, সামাজিক বাস্তবতা ও কাজের ধরন বিবেচনায় রেখে।
বাংলাদেশ একটি গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার দেশ। এখানে পুলিশকে দীর্ঘ সময় রোদে-বৃষ্টিতে কাজ করতে হয়। নারী পুলিশদের ক্ষেত্রে সামাজিক বাস্তবতা আরও সংবেদনশীল। এসব দিক বিবেচনায় না নিয়ে যদি কেবল নকশাগত পরিবর্তন আনা হয়, তাহলে তা টেকসই হয় না।
আগের পোশাকে ফেরার দাবি: নস্টালজিয়া না বাস্তব প্রয়োজন?
পুলিশের আগের ইউনিফর্মে ফিরে যাওয়ার দাবি অনেকের কাছে নস্টালজিয়া মনে হতে পারে। কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায়, এই দাবি আসলে পেশাগত পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষার আকুতি। আগের পোশাকে পুলিশের স্বাতন্ত্র্য ছিল, জনগণের চোখে ছিল আলাদা এক অবস্থান। নারী পুলিশরাও তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন- এমন মত কম নয়।
তবে আগের পোশাক হুবহু ফিরিয়ে আনা কি একমাত্র সমাধান? নাকি আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে এমন একটি ইউনিফর্ম নকশা করা উচিত, যা মর্যাদাসম্পন্ন, ব্যবহারিক এবং নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই উপযোগী?
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ইউনিফর্ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মতামত কতটা গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে নারী পুলিশদের অভিজ্ঞতা ও চাহিদা প্রায়ই নীতিনির্ধারণের টেবিলে উপেক্ষিত থাকে। এটি একটি গুরুতর ত্রুটি।
যদি সত্যিই পুলিশ বাহিনীর পেশাগত সক্ষমতা ও মনোবল বাড়াতে হয়, তাহলে ইউনিফর্ম বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নারী পুলিশসহ সব স্তরের সদস্যদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা জরুরি। পরীক্ষামূলকভাবে বিভিন্ন নকশা ব্যবহার, মতামত সংগ্রহ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ- এটাই হতে পারে যৌক্তিক পথ।
পুলিশের ইউনিফর্ম কোনো ফ্যাশন শো নয়। এটি রাষ্ট্রের শক্তি, শৃঙ্খলা ও আইনের দৃশ্যমান প্রতীক। বিশেষ করে নারী পুলিশদের পোশাক যদি তাদের জন্য বিব্রতকর হয়, তাহলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত অস্বস্তির বিষয় নয়- এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার লক্ষণ।
বাংলাদেশ পুলিশ যদি সত্যিই আধুনিক, মানবিক ও দক্ষ বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠতে চায়, তাহলে ইউনিফর্মের প্রশ্নে নতুন করে ভাবতেই হবে। আগের পোশাকে ফেরা হোক কিংবা নতুন নকশায় পরিবর্তন- যে সিদ্ধান্তই আসুক না কেন, তা হতে হবে মাঠের বাস্তবতা, নারী পুলিশের অভিজ্ঞতা ও পেশাগত মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে। কারণ পোশাকই শেষ কথা নয় কিন্তু ভুল পোশাক অনেক সময় সঠিক কাজের পথও কঠিন করে তোলে।
বিকেপি/এমএম

