সভ্য সমাজে শিশু অপরাধী নয়- শিশু ভুল করতে পারে, বিচ্যুত হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাকে শাস্তির পথে ঠেলে দেওয়া নয়; বরং সংশোধন, সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি করা। অথচ বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন আদালতে প্রায়ই দেখা যায় শিশু বা নাবালক অভিযুক্তদের হাতকড়া পরিয়ে আদালতে আনা-নেওয়া করা হচ্ছে। এই চিত্র শুধু বেদনাদায়ক নয়, আইনবিরোধীও বটে।
শিশু আইন এবং আন্তর্জাতিক সনদ উভয়ই এ ধরনের আচরণ স্পষ্টভাবে নিরুৎসাহিত করে। তা সত্ত্বেও কেন এমন চর্চা চলমান, সে প্রশ্ন আজ নতুন করে সামনে এসেছে। মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি- শিশু আসামিদের আদালতে আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক, সংবেদনশীল ও আইনসম্মত আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।
শিশু আইন কী বলে :
বাংলাদেশে শিশুদের বিচার ও সুরক্ষার জন্য আলাদা আইন রয়েছে শিশু আইন, ২০১৩। এই আইনের মূল দর্শন হলো “শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ”। আইনটি স্পষ্টভাবে বলে, শিশুদের সঙ্গে এমন কোনো আচরণ করা যাবে না যা তাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে বা মানসিকভাবে আঘাত করে। হাতকড়া পরানো, প্রকাশ্যে শাস্তির মতো আচরণ, বা প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড় করানো সবই এই আইনের চেতনার পরিপন্থী।
শিশু আইন অনুযায়ী, শিশু অভিযুক্তদের আলাদা পরিবেশে রাখা, আলাদা যানবাহনে আনা-নেওয়া করা এবং আদালতে উপস্থাপনের সময় সর্বোচ্চ গোপনীয়তা ও সম্মান বজায় রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। হাতকড়া পরানো সেখানে ব্যতিক্রম তো নয়ই, বরং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ আচরণ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
আন্তর্জাতিক সনদের বাধ্যবাধকতা :
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদের (Convention on the Rights of the Child) সদস্য রাষ্ট্র। এই সনদে বলা হয়েছে, শিশুদের গ্রেপ্তার, আটক বা বিচার প্রক্রিয়ায় সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে তাদের মর্যাদা ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।
হাতকড়া পরানো একটি শিশুকে অপরাধী হিসেবে কলঙ্কিত করে, সমাজের চোখে তাকে অপরিবর্তনীয় “অপরাধী” হিসেবে চিহ্নিত করে দেয়। এটি শুধু সনদের লঙ্ঘন নয়, শিশুর ভবিষ্যৎ সামাজিক পুনর্গঠনের পথও সংকুচিত করে।
অনেকেই প্রশ্ন করছেন যে, নিরাপত্তার স্বার্থে কি হাতকড়া পরানো প্রয়োজন? বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ শিশু আসামি কোনোভাবেই পালিয়ে যাওয়ার মতো ঝুঁকি তৈরি করে না। তাদের বেশিরভাগই ভীত, বিভ্রান্ত এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে অনভিজ্ঞ। সেখানে হাতকড়া পরানো অনেক সময় নিরাপত্তার চেয়ে প্রশাসনিক অভ্যাস বা অবহেলার ফল বলেই মনে হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ হয়তো যুক্তি দেখাতে পারে এটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। কিন্তু শিশুদের ক্ষেত্রে “নিয়মিত প্রক্রিয়া” শব্দটি প্রযোজ্য নয়। কারণ শিশু বিচার ব্যবস্থা মূলত ব্যতিক্রমী, সংবেদনশীল ও মানবিক হওয়ার কথা।
হাতকড়া পরানো কেবল শারীরিক বাঁধন নয়; এটি একটি গভীর মানসিক আঘাত। একজন শিশু যখন আদালতে যাওয়ার পথে হাতকড়া পরা অবস্থায় মানুষের দৃষ্টির সামনে পড়ে, তখন তার মনে জন্ম নেয় লজ্জা, ভয় ও আত্মঘৃণা। এই অভিজ্ঞতা তার মানসিক বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীরা বাংলাদেশের খবরকে গতকাল বলেন, শিশুকালে এমন অপমানজনক অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ, যে ব্যবস্থার উদ্দেশ্য সংশোধন, সেই ব্যবস্থাই উল্টো ফল ডেকে আনতে পারে। এই প্রশ্নের উত্তর একক নয়। দায়িত্ব রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রসিকিউশন, আদালত প্রশাসন এবং নীতিনির্ধারকদের সবার ওপর। বিশেষ করে বাংলাদেশ পুলিশ সদস্যদের শিশু আইন ও শিশু-বান্ধব আচরণ বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।
আদালত প্রাঙ্গণে শিশু আসামিদের জন্য আলাদা প্রবেশপথ, আলাদা অপেক্ষাকক্ষ এবং আলাদা পরিবহন ব্যবস্থার বিষয়টি কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে প্রায়ই অনুপস্থিত। এই ব্যবধান কমাতে প্রশাসনিক সদিচ্ছাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
শিশু আদালত প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল- একটি ভয়মুক্ত, সহানুভূতিশীল পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু যদি আদালতে আনার পথেই শিশু অপমানিত ও ভীত হয়ে পড়ে, তাহলে সেই উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। শিশুবান্ধব বিচার ব্যবস্থা মানে শুধু আলাদা আদালত কক্ষ নয়; বরং পুরো প্রক্রিয়াটিকেই শিশুর মানসিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।
শিশুদের ক্ষেত্রে হাতকড়ার পরিবর্তে অভিভাবকের উপস্থিতি, নারী বা প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা দ্বারা তত্ত্বাবধান, এবং নরম ভাষায় আচরণ এসবই হতে পারে কার্যকর বিকল্প।
এই অনিয়ম রোধে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও আইনজীবীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবার যখন কোনো শিশুকে হাতকড়া পরানো অবস্থায় আদালতে আনা হয় এবং সেটি চুপচাপ মেনে নেওয়া হয়, তখন আমরা সবাই এক ধরনের নীরব সম্মতি দিই। এই সংস্কৃতি ভাঙতে হবে।
গণমাধ্যমে দায়িত্বশীল প্রতিবেদন, আদালতের নজরদারি এবং প্রয়োজনে রিট আবেদন- সবকিছুই এই মানবিক লঙ্ঘন বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
শিশু আসামিদের হাতকড়া পরানো কোনো ছোটখাটো প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি আইন, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার ও মানবিক মূল্যবোধের সরাসরি লঙ্ঘন। একটি রাষ্ট্রকে বিচার করা হয় সে তার শিশুদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে- এই মানদণ্ডে আমাদের আরও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন আছে।
শিশু ভুল করলে তাকে সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে, অপমানের শিকলে বাঁধতে নয়। আদালতে আনা-নেওয়ার প্রতিটি ধাপে যদি শিশুর মর্যাদা ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তবেই আমরা বলতে পারব- আইন শুধু কঠোর নয়, মানবিকও। রাষ্ট্র, সমাজ ও বিচার ব্যবস্থার সম্মিলিত উদ্যোগেই কেবল শিশুদের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সহানুভূতিশীল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।
বিকেপি/এমএম

