Logo

আইন ও বিচার

দেউলিয়া হওয়া মানেই কি দায় এড়িয়ে যাওয়া?

Icon

বায়েজিদ তাশরীক

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:০৩

 অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, ব্যবসায়িক মন্দা কিংবা আকস্মিক বিপর্যয়ে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা ভেঙে পড়তে পারে। দেনা পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়লে যে আইনি আশ্রয়টির কথা সামনে আসে, তা হলো দেউলিয়া ঘোষণা। কিন্তু দেউলিয়া হওয়া মানেই কি দায় এড়িয়ে যাওয়া? নাকি এটি একটি নিয়ন্ত্রিত, স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া, যেখানে দেনাদার ও পাওনাদার উভয়ের স্বার্থই সুরক্ষিত থাকে? 

দেউলিয়া ঘোষণা হলো আদালতের একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি- যেখানে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান প্রমাণ করে যে, তারা নির্ধারিত সময়ে তাদের বৈধ দেনা পরিশোধে অক্ষম। এ প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য দুইটি: এক. দেনাদারের অবশিষ্ট সম্পদ সুশৃঙ্খলভাবে বণ্টন করে পাওনাদারদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা। দুই. দেনাদারকে আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে অযাচিত হয়রানি, অনিয়ন্ত্রিত দখল বা বেআইনি চাপ থেকে সুরক্ষা দেওয়া।

বাংলাদেশে দেউলিয়া সংক্রান্ত বিধান মূলত দেউলিয়া আইন, ১৯৯৭-এ সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত। এই আইন দেউলিয়াত্বকে সামাজিক কলঙ্ক নয়, বরং একটি আইনি সমাধান হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে।

কারা দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন করতে পারেন

আইন অনুযায়ী, নিম্নোক্ত পরিস্থিতিতে দেউলিয়া ঘোষণার প্রশ্ন আসে-  ব্যক্তি দেনাদার: যিনি নিয়মিত আয় থাকা সত্ত্বেও সামগ্রিক দেনা পরিশোধে অক্ষম। ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা: ব্যবসায়িক ক্ষতি, বাজার ধস বা ঋণভার বেড়ে যাওয়ায় দেনা শোধে ব্যর্থ। পাওনাদার: নির্দিষ্ট শর্তে পাওনাদারও আদালতে আবেদন করে দেনাদারকে দেউলিয়া ঘোষণার উদ্যোগ নিতে পারেন।

এখানে লক্ষণীয়- দেউলিয়া ঘোষণা একতরফা সুবিধা নয়; বরং উভয় পক্ষের স্বার্থে নিয়ন্ত্রিত বিচারিক প্রক্রিয়া।

আদালতের মাধ্যমে দেউলিয়া ঘোষণার ধাপে ধাপে পদ্ধতি-

১) আবেদন দাখিল : দেনাদার নিজে অথবা যোগ্য পাওনাদার সংশ্লিষ্ট জেলা জজ আদালতে দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন দাখিল করেন। আবেদনে দেনার পরিমাণ, পাওনাদারের তালিকা, সম্পদের বিবরণ এবং দেনা পরিশোধে অক্ষমতার কারণ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয়।

২) প্রাথমিক শুনানি ও নোটিশ : আদালত আবেদন গ্রহণযোগ্য মনে করলে প্রাথমিক শুনানি নির্ধারণ করে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহকে নোটিশ প্রদান করে। এ পর্যায়ে আদালত দেখে- আবেদনটি কৌশলগত অপব্যবহার কি না।

৩) অস্থায়ী রিসিভার/অফিসিয়াল রিসিভার নিয়োগ : দেউলিয়াত্বের সম্ভাবনা থাকলে আদালত একজন অফিসিয়াল রিসিভার নিয়োগ করতে পারেন। তিনি দেনাদারের সম্পদ শনাক্ত, রক্ষণাবেক্ষণ ও হিসাব গ্রহণের দায়িত্ব পালন করেন।

৪) সম্পদ তালিকা ও তদন্ত :  দেনাদারের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত হয়। দেনা সৃষ্টি, লেনদেনের স্বচ্ছতা, কোনো প্রতারণা বা সম্পদ গোপনের চেষ্টা হয়েছে কি না- এসব বিষয়ে তদন্ত হয়।

৫) চূড়ান্ত শুনানি :  উভয় পক্ষের বক্তব্য, নথি ও তদন্ত প্রতিবেদন বিবেচনা করে আদালত সিদ্ধান্তে পৌঁছান- দেনাদারকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হবে কি না।

৬) দেউলিয়া ঘোষণা ও আদেশ :  আদালত দেউলিয়া ঘোষণা দিলে দেনাদারের নির্দিষ্ট সম্পদ আদালতের তত্ত্বাবধানে আসে। এরপর আইন অনুযায়ী পাওনাদারদের মধ্যে বণ্টন প্রক্রিয়া শুরু হয়।

৭) মুক্তি (Discharge) :  আইনি শর্ত পূরণ ও সহযোগিতা নিশ্চিত হলে নির্দিষ্ট সময় পরে দেনাদার মুক্তি আদেশ পেতে পারেন। এতে পূর্বের দেনার দায় থেকে আংশিক বা পূর্ণ অব্যাহতি মিলতে পারে, তবে প্রতারণা প্রমাণিত হলে এই সুবিধা প্রযোজ্য নয়।

দেনাদার ও পাওনাদারের অধিকার-দায়

দেনাদারের অধিকার, বেআইনি চাপ, হুমকি বা জোরপূর্বক দখল থেকে সুরক্ষা, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সম্পদ ব্যবস্থাপনা, শর্তসাপেক্ষে মুক্তির সুযোগ, দেনাদারের দায়, সম্পদের পূর্ণ প্রকাশ, তদন্তে সহযোগিতা, প্রতারণা বা সম্পদ গোপন না করা, পাওনাদারের অধিকার, ন্যায্য বণ্টনে অংশগ্রহণ, তদন্তে আপত্তি ও তথ্য উপস্থাপন অনিয়ম হলে আদালতে আবেদন।

দেউলিয়া আইন অপব্যবহারের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভুয়া দেউলিয়াত্ব, সম্পদ আত্মসাৎ, আত্মীয়ের নামে হস্তান্তর- এসব রোধে আইন কঠোর। প্রতারণা প্রমাণিত হলে দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন খারিজের পাশাপাশি শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া যায়। এই বিষয়ে উচ্চতর আদালতসমূহ, বিশেষত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, বারবার স্বচ্ছতা ও সদিচ্ছার ওপর জোর দিয়েছেন।

একটি কার্যকর দেউলিয়া ব্যবস্থা অর্থনীতির জন্য অক্সিজেন। ব্যর্থ উদ্যোগকে নিয়ন্ত্রিতভাবে সমাপ্ত করে নতুন উদ্যোগের পথ তৈরি হয়। একই সঙ্গে পাওনাদারের আস্থা বাড়ে কারণ তারা জানে, আইনের শাসনে তাদের পাওনা আদায়ের ন্যায্য সুযোগ থাকবে। ফলে বাজারে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত হয়, বিনিয়োগ পরিবেশ সুদৃঢ় হয়।

বাস্তবতায় মামলার দীর্ঘসূত্রতা, অফিসিয়াল রিসিভারের সক্ষমতার ঘাটতি, তথ্যপ্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার- এসব কারণে প্রক্রিয়া ধীর হয়।

বেশ কয়েকজন বিজ্ঞ আইনজীবী বাংলাদেশের খবরকে এ বিষয়ে কয়েকটি সংস্কারের প্রস্তাবের কথা বলেছেন। যেমন- বিশেষায়িত দেউলিয়া বেঞ্চ বা ট্রাইব্যুনাল, ডিজিটাল সম্পদ-রেজিস্ট্রি ও অনলাইন নোটিশ, সময়সীমা নির্ধারণ ও জবাবদিহি ও পেশাদার রিসিভার প্রশিক্ষণ।

দেউলিয়া ঘোষণা কোনো লজ্জার সনদ নয়; এটি আইনসম্মত পুনর্গঠনের পথ। তবে এই পথের সাফল্য নির্ভর করে সততা, স্বচ্ছতা ও বিচারিক দক্ষতার ওপর। দেনাদারকে যেমন দায়িত্বশীল হতে হবে, তেমনি পাওনাদারকেও আইনের সীমারেখায় থাকতে হবে। শক্তিশালী দেউলিয়া ব্যবস্থা মানেই শক্তিশালী অর্থনীতি- এই উপলব্ধিই আমাদের এগিয়ে নিতে পারে।

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর