Logo

আইন ও বিচার

জামিন প্রশ্নে আইনজীবীদের আদালত বর্জন আদৌ কি যুক্তিসঙ্গত?

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৫১

জামিন প্রশ্নে আইনজীবীদের আদালত বর্জন  আদৌ কি যুক্তিসঙ্গত?

 দেশের বিচারব্যবস্থায় “জামিন” কোনো করুণা নয়; বরং এটি একটি মৌলিক আইনগত অধিকার, যা ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের ভারসাম্য রক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আসামিকে জামিন দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আইনজীবীদের আদালত বর্জনের ঘটনা জনমনে যেমন প্রশ্ন তুলেছে, তেমনি আইন, নৈতিকতা ও পেশাগত শৃঙ্খলার সীমারেখাও নতুন করে আলোচনায় এনেছে।

ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় জামিনের নীতিটি মূলত নিরপরাধ ধারণা (presumption of innocence) ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষার ওপর দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশ সংবিধান-এর ৩২ অনুচ্ছেদে ব্যক্তিস্বাধীনতার নিশ্চয়তা এবং আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। একইসঙ্গে ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) আদালতকে জামিন প্রশ্নে বিস্তৃত কিন্তু যুক্তিসংগত বিবেচনার ক্ষমতা দিয়েছে।

তবে জামিন স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়। অপরাধের প্রকৃতি, শাস্তির মাত্রা, সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রভাবের আশঙ্কা, পলায়নের ঝুঁকি, পুনরাবৃত্ত অপরাধের সম্ভাবনা- এসবই বিচারিক বিবেচনার অংশ। অর্থাৎ, জামিন দেবেন কি দেবেন না- এ সিদ্ধান্ত আদালতের; আইনজীবীর দাবি বা চাপের বিষয় নয়।

আইনজীবীদের আদালত বর্জন সাধারণত প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়- বিচারকের আচরণ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা পেশাগত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো মামলায় জামিন না দেয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আদালত বর্জন ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। এখানে প্রশ্নটি কেবল প্রতিবাদের নয়; এটি বিচারিক স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের ধারাবাহিকতাকে প্রভাবিত করে কি না- সেটিই মুখ্য।

আইনজীবী পেশা একটি সেবাভিত্তিক ও নৈতিক পেশা। আদালত বর্জনের ফলে বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষ- বিশেষত হাজতবাসী আসামি, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিচার বিলম্বিত হয়, মামলার জট বাড়ে, আর “বিচার বিলম্ব মানেই বিচার অস্বীকার”- এই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হয়।

বিচারিক স্বাধীনতা ও বার-এর ভূমিকা

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ। কোনো মামলায় বিচারক জামিন না দিলে, সেটি ভুল বা পক্ষপাতদুষ্ট মনে হলে তার প্রতিকার পথ আইনেই আছে: উচ্চ আদালতে আবেদন, রিভিশন, আপিল। কিন্তু আদালত বর্জন করে বিচারিক সিদ্ধান্তকে চাপের মুখে ফেলা হলে, তা বিচারিক স্বাধীনতার পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বারবার বলেছেন- আইনজীবীদের আন্দোলন ও প্রতিবাদের অধিকার আছে, তবে তা যেন বিচারপ্রক্রিয়াকে অচল না করে। বার ও বেঞ্চের সম্পর্ক সহযোগিতামূলক; প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নয়। আইনজীবী আদালতের “অফিসার”- এই পরিচয় তাদের আচরণে সংযম ও দায়িত্বশীলতা দাবি করে।

আইনজীবী সমিতির ডাকে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি আইনসম্মত হতে পারে। কিন্তু যখন সেই কর্মসূচি বিচারকার্য স্থবির করে, বিচারপ্রার্থীর অধিকার ক্ষুণ্ন করে, তখন আইনসম্মততার সীমা অতিক্রান্ত হয়। উচ্চ আদালতের নজিরে দেখা যায়- অযৌক্তিক আদালত বর্জনকে কখনো কখনো পেশাগত অসদাচরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

এখানে একটি সূ² পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ: নীতিগত বা কাঠামোগত সমস্যার প্রতিবাদ এক বিষয়, আর নির্দিষ্ট মামলার বিচারিক সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশে আদালত বর্জন আরেক বিষয়। দ্বিতীয়টি অধিকতর সমস্যাজনক, কারণ এতে বিচারকের ওপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে।

যদি প্রশ্ন করা হয় এই ধরনের বর্জনে কার লাভ? বাস্তবতা হলো, সাময়িক আবেগ বা রাজনৈতিক বার্তা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এর লাভ খুব কম। ক্ষতি বেশি- বিচার বিলম্বিত হয়, বিচার বিভাগের ওপর জনআস্থা কমে, আইনজীবী সমাজের পেশাগত মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ে

আইনজীবীরা যদি জামিন না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে অন্যায় মনে করেন, যুক্তিসম্মত পথ হলো আইনি লড়াই, লিখিত আদেশ চ্যালেঞ্জ, উচ্চতর আদালতের শরণাপন্ন হওয়া। সেটিই আইনের শাসনের পথ।

গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশ ও প্রতিবাদের অধিকার অপরিহার্য। কিন্তু এই অধিকার যখন অন্যের মৌলিক অধিকারকে খর্ব করে, তখন ভারসাম্য রক্ষা জরুরি হয়ে পড়ে। 

আসামিকে জামিন দেওয়া বা না দেওয়া- এটি বিচারকের আইনগত বিবেচনার বিষয়। সেই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আদালত বর্জন আইনসম্মত হলেও সব ক্ষেত্রে যুক্তিসম্মত নয়; বরং অনেক সময় তা ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আইনজীবী সমাজের শক্তি তাদের যুক্তিতে, আইনি দক্ষতায় ও নৈতিক অবস্থানে- চাপের কৌশলে নয়। আইনের শাসন টিকিয়ে রাখতে হলে বার ও বেঞ্চ উভয়েরই সংযম, শ্রদ্ধা ও দায়িত্বশীলতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া জরুরি।

বিকেপি/এমএম 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর