Logo

আইন ও বিচার

রায়ের অপেক্ষায়

বিচার বিলম্ব কি নীরব অবিচার নয়?

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৪৭

বিচার বিলম্ব কি নীরব অবিচার নয়?

দেশের বিচার ব্যবস্থায় একটি বহুল আলোচিত কিন্তু দীর্ঘদিনের উপেক্ষিত সমস্যা হলো রায় ঘোষণায় অযৌক্তিক বিলম্ব। বিশেষ করে সিভিল মামলায়- ভূমি ও সম্পত্তি সংক্রান্ত মোকদ্দমায় নিম্ন আদালত দীর্ঘদিন ধরে ‘রায়ের জন্য সময়’ নিয়ে চলেছেন। কখনো আদালতের ব্যস্ততা, কখনো মামলার চাপ, আবার কখনো অনিবার্য প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর রায় ঝুলে থাকে। এই দীর্ঘসূত্রতা কেবল বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তিই বাড়ায় না, বরং ন্যায়বিচারের মৌলিক দর্শনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

দেশের সংবিধান নাগরিককে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করেছে। বিচার মানে শুধু শুনানি নয়; যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়াই প্রকৃত বিচার। কিন্তু যখন একটি সিভিল মামলা সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পরও দুই বছর বা তার বেশি সময় ধরে রায়ের অপেক্ষায় থাকে, তখন তা কার্যত ন্যায়বিচারকে অস্বীকার করার শামিল।

আইনজ্ঞদের বহুল উদ্ধৃত একটি নীতিবাক্য হলো- “Justice delayed is justice denied.”

অর্থাৎ বিচার বিলম্বিত হলে তা ন্যায়বিচার থাকে না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই উক্তিটি যেন প্রতিদিন নতুন করে সত্য প্রমাণিত হচ্ছে।

নিম্ন আদালতে রায় ঝুলে থাকার সংস্কৃতি

বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক নিম্ন আদালতে যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পরও রায় ঘোষণা দীর্ঘদিন পিছিয়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়- রায় লেখার সময় নেই, মামলার চাপ বেশি, প্রশাসনিক বা ব্যক্তিগত ব্যস্ততা, বদলি বা পদোন্নতির অপেক্ষা, এসব কারণ একেবারে অমূলক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই কারণগুলোর খেসারত কেন বিচারপ্রার্থীদের দিতে হবে?

একটি জমি সংক্রান্ত মামলা ঝুলে থাকলে একজন কৃষক তার জমি ব্যবহার করতে পারেন না। একজন উত্তরাধিকারী সম্পত্তির ভাগ পান না। একজন বৃদ্ধ মানুষ জীবদ্দশায় রায় দেখে যেতে পারেন না। এই সামাজিক বাস্তবতাই বিচার বিলম্বকে কেবল আইনি সমস্যা নয়, মানবিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে।

বাদী ও বিবাদী উভয়ই ভুক্তভোগী : 

সাধারণ ধারণা হলো, মামলায় বাদীই বেশি ভোগান্তিতে পড়ে। বাস্তবে মামলার দীর্ঘসূত্রতা বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

বাদী তার দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না, বিবাদী দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে। উভয় পক্ষই অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মামলা পরিচালনার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ফলে বিচার প্রক্রিয়া মানুষের কাছে ভয়ের বিষয় হয়ে ওঠে। অনেকেই ন্যায্য দাবি থাকা সত্ত্বেও আদালতে যেতে চান না।

দেশের দেওয়ানি কার্যবিধিতে (CPC) রায় ঘোষণার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর যথাসম্ভব দ্রুত রায় প্রদান আদালতের দায়িত্ব। উচ্চ আদালতের বিভিন্ন নির্দেশনাতেও বলা হয়েছে

অযৌক্তিক বিলম্ব গ্রহণযোগ্য নয়, বিচারকের ব্যস্ততা বিচারপ্রার্থীর অধিকারের ঊর্ধ্বে নয়।

এমনকি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন সময় নিম্ন আদালতকে রায় ঝুলে না রাখার বিষয়ে মৌখিক ও লিখিত নির্দেশনা দিয়েছে। তবু বাস্তব চিত্র খুব একটা বদলায়নি।

রায় ঘোষণায় অস্বাভাবিক বিলম্ব হলে ভুক্তভোগী পক্ষগুলো সম্পূর্ণ অসহায় নয়। আইন কিছু পথ খোলা রেখেছে-  ১. লিখিত আবেদন (Petition): আদালতে বিনীতভাবে একটি আবেদন করে রায় ঘোষণার অনুরোধ জানানো যায়। ২. উচ্চ আদালতে দৃষ্টি আকর্ষণ: চরম বিলম্ব হলে উচ্চ আদালতে সংশ্লিষ্ট আদালতকে নির্দেশ প্রদানের আবেদন করা যেতে পারে। 

৩. আইনজীবীর সক্রিয় ভূমিকা: আইনজীবীদের উচিত আদালতের নজরে সম্মানের সঙ্গে বিষয়টি উপস্থাপন করা এবং অনর্থক সময়ক্ষেপণ এড়াতে সহায়তা করা।

তবে এসব পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রেও বিচারপ্রার্থীরা প্রায়ই মানসিক দ্বিধায় থাকেন কাছে যদি আদালত বিরূপ হন! এই ভয়ও বিচার ব্যবস্থার একটি নীরব ব্যর্থতা।

দেশে জমি সংক্রান্ত মামলা যেন দীর্ঘসূত্রতার প্রতীক। একটি মামলা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গড়ায়। রায় ঝুলে থাকলে  অবৈধ দখলদার উৎসাহ পায়, প্রকৃত মালিক নিরুৎসাহিত হয়, সামাজিক সংঘাত বাড়ে। ফলে আদালত শুধু মামলা নিষ্পত্তির জায়গা নয়, বরং অচলাবস্থার প্রতীক হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে পড়ে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কেবল বিচারকদের সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মামলার চাপ অনুযায়ী বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি, রায় লেখার জন্য সহায়ক ব্যবস্থা, রায় ঝুলে থাকার বিষয়ে কার্যকর মনিটরিং ও সময়সীমা নির্ধারণ ও তার বাস্তব প্রয়োগ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিচার বিলম্বকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা।

বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা টিকে থাকে দ্রুত ও কার্যকর ন্যায়বিচারের ওপর। যখন একটি সিভিল মামলায় দুই বছর ধরে রায় ঝুলে থাকে, তখন কেবল একটি মামলা নয়, রাষ্ট্রের ন্যায়বোধও প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিচার বিলম্ব যদি নিয়মে পরিণত হয়, তবে তা আইনের শাসনের জন্য অশনিসংকেত। রায়ের অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলো কেবল মামলার পক্ষ নয়, তারা রাষ্ট্রের নাগরিক। 

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর