স্বাস্থ্যসেবা জরিমানা হলেও থামছে না অনিয়ম
এম আর ইসলাম টিপু
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৫৩
দেশে স্বাস্থ্যসেবা খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অংশ হলো ডায়াগনস্টিক সেন্টার। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন থেকে শুরু করে রোগ নির্ণয়ের শেষ ধাপ পর্যন্ত এই খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো দেশজুড়ে অসংখ্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নির্ধারিত মূল্যের তোয়াক্কা না করেই চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। রোগীর অসহায়ত্ব, ভয় ও অজ্ঞতাকে পুঁজি করে অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে একপ্রকার নীরব বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট।
দেশে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর সেবামূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা রাষ্ট্র নিজ হাতে রেখেছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়-এর অধীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সময়ে সময়ে বিভিন্ন পরীক্ষার সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে থাকে। এমআরআই, সিটি স্ক্যান, এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম, প্যাথলজি পরীক্ষা সব কিছুরই সরকার নির্ধারিত চার্ট রয়েছে।
আইনের ভাষায় এটি নিছক প্রশাসনিক নির্দেশনা নয়; বরং বাধ্যতামূলক মানদণ্ড। এই নির্ধারিত মূল্যের বেশি আদায় করা সরাসরি আইন লঙ্ঘনের শামিল।
ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনা ও মূল্য নির্ধারণ সংক্রান্ত প্রধান আইনগুলো হলো- বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮২, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯, দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (প্রতারণা ও অসাধু লেনদেন সংক্রান্ত ধারা)।
উক্ত অধ্যাদেশ অনুযায়ী, লাইসেন্সপ্রাপ্ত ডায়াগনস্টিক সেন্টার সরকার নির্ধারিত শর্ত মেনে পরিচালিত হতে বাধ্য। শর্ত লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল পর্যন্ত করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের রয়েছে।
কাগজে-কলমে নিয়ম যতই শক্ত হোক, বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রাজধানী থেকে জেলা প্রায় সর্বত্র একই চিত্র। সরকার যেখানে একটি পরীক্ষার সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করেছে, সেখানে অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার দ্বিগুণ বা তারও বেশি অর্থ আদায় করছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে কোনো রসিদ পর্যন্ত দেওয়া হয় না। মূল্য তালিকা টানানো থাকলেও তা কেবল দেয়ালের শোভা।
এই অনিয়মের পেছনে কাজ করছে তিনটি বড় কারণ তদারকির অভাব, রোগীর আইনি অজ্ঞতা, প্রভাবশালী মালিকানার দৌরাত্ম্য।
আইন অনুযায়ী, রোগী একজন ভোক্তা। ফলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর আওতায় রোগী প্রতিকার চাইতে পারেন। নির্ধারিত মূল্যের বেশি অর্থ আদায় করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড, বা ২ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের ক্ষমতা রয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর-এর।
একটি ভয়ংকর প্রবণতা ক্রমেই স্পষ্ট, রাজধানী ঢাকার অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার এখন আর স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং মুনাফাকেন্দ্রিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, কমিশনভিত্তিক রেফারেল, একই পরীক্ষার জন্য ভিন্ন ভিন্ন মূল্য সব মিলিয়ে রোগী যেন পরীক্ষাগারের কাছে জিম্মি। একজন রোগী যখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন তাঁর কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় কেবল আইন লঙ্ঘন নয়- মানবিকতারও চরম অবমাননা।
আইন অনুযায়ী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিয়মিত মনিটরিং হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এসব অভিযান অনেক সময় খণ্ডকালীন ও প্রতীকী হয়ে পড়ে। জরিমানা হয়, কিন্তু অনিয়ম থামে না। কারণ শাস্তি নিশ্চিত নয়, বরং তা অনেক সময় ‘ম্যানেজযোগ্য’ হয়ে ওঠে।
এই সংকট থেকে উত্তরণে কয়েকটি বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন ১. মূল্য তালিকা দৃশ্যমান করা। প্রতিটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সরকার নির্ধারিত মূল্য তালিকা বড় অক্ষরে প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করতে হবে। ২. ডিজিটাল মনিটরিং। পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন ও বিলিং অনলাইনে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজের আওতায় আনতে হবে। ৩. ভ্রাম্যমাণ আদালত জোরদার, অর্থাৎ অভিযান যেন হঠাৎ নয়, বরং নিয়মিত ও শাস্তিমূলক হয়। ৪. রোগীর সচেতনতা বৃদ্ধি- গণমাধ্যমে প্রচার, হাসপাতাল ও ক্লিনিকে লিফলেটের মাধ্যমে রোগীকে জানাতে হবে- তিনি কত টাকা দিতে বাধ্য, আর কতটা নয়।
স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নির্ধারিত মূল্যের বাইরে অর্থ আদায় এই অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন। আইন আছে, কিন্তু তার কার্যকর প্রয়োগই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্র, প্রশাসন ও নাগরিক এই তিন পক্ষ একসঙ্গে সচেতন না হলে এই নীরব লুটপাট বন্ধ হবে না। আজই সময় ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে বাণিজ্যের নয়, মানবিকতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর।
বিকেপি/এমএম

