Logo

আইন ও বিচার

কর্মক্ষম স্বামী, নির্যাতিত স্ত্রী

আইনের নীরবতা কি চলতেই থাকবে?

Icon

সোহানা ইয়াসমিন

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৬, ২২:৪৩

আইনের নীরবতা কি চলতেই থাকবে?

দেশের হাজারো ঘরে নীরবে ঘটে চলা এক বাস্তবতার নাম কর্মক্ষম হয়েও স্বামীর কাজ না করা, পরিবারের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া, স্ত্রীর ওপর নির্যাতন চালানো এবং সন্তানের মৌলিক অধিকার অস্বীকার করা। সমাজে এই চিত্র নতুন নয়, কিন্তু উদ্বেগজনক বিষয় হলো এটি ক্রমেই স্বাভাবিকীকৃত হয়ে উঠছে। বিশেষত শহর ও আধা-শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারে ‘ঘরে বসে থাকা স্বামী’ আর ‘সব সামলানো স্ত্রী’ যেন নীরব এক বৈষম্যের কাঠামো তৈরি করেছে।

একজন নারী দিনের পর দিন গৃহস্থালি সামলান, সন্তানকে মানুষ করেন, প্রয়োজনে স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করে সংসার চালান; অথচ কর্মক্ষম স্বামী সারাদিন মোবাইল ফোনে সময় কাটান, কোনো কথা বললে মারধর করেন এমন বাস্তবতা শুধু পারিবারিক সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক ও আইনগত ব্যর্থতার প্রতিফলন।

দায়িত্বহীনতা যখন অপরাধ:

আইন স্পষ্টভাবে বলে, স্বামী ও পিতা হিসেবে পরিবারের ভরণপোষণ দেওয়া একটি বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। কর্মক্ষম হয়েও সেই দায়িত্ব ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া নিছক নৈতিক অবক্ষয় নয়; এটি আইন লঙ্ঘন। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, সমাজের চাপ, লোকলজ্জা ও অর্থনৈতিক অসহায়ত্বের কারণে অধিকাংশ নারী এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারেন না।

এখানে প্রশ্ন উঠে একজন নারী কতদিন ‘সংসার বাঁচানোর’ অজুহাতে নিজের ও সন্তানের জীবন বিপন্ন করবেন? আর রাষ্ট্র কতদিন এই নিরব নিপীড়নকে ‘পারিবারিক বিষয়’ বলে পাশ কাটাবে?

পারিবারিক সহিংসতা : ঘরের ভেতরের অপরাধ

স্ত্রীর ওপর মারধর, মানসিক নির্যাতন কিংবা হুমকি- এসবকে এখনও অনেকেই “স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া” হিসেবে হালকা করে দেখেন। কিন্তু আইন তা বলে না। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে- শারীরিক, মানসিক, যৌন বা অর্থনৈতিক নির্যাতন সবই শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এই আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- ভুক্তভোগী নারী চাইলে দ্রুত সুরক্ষা আদেশ পেতে পারেন। অর্থাৎ আদালত স্বামীকে নির্যাতন বন্ধের নির্দেশ দিতে পারে, প্রয়োজনে আলাদা বসবাসের অনুমতিও দিতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- এই আইনের প্রয়োগ এখনো খুব সীমিত। সচেতনতার অভাব, পুলিশের অনীহা এবং আদালতকেন্দ্রিক জটিলতার কারণে বহু নারী এই আইনের সুফল পান না।

ভরণপোষণকে আমাদের সমাজে এখনো ‘দান’ বা ‘দয়া’ হিসেবে দেখা হয়। অথচ আইন এটিকে দেখে অধিকার হিসেবে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫ ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, স্বামী কর্মক্ষম হয়েও যদি স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণ না দেন, তবে আদালত তাকে বাধ্য করতে পারে।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো স্বামীর চাকরি না থাকা বা “কাজ করি না”- এই যুক্তি আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়, যদি প্রমাণিত হয় যে তিনি কর্মক্ষম। অর্থাৎ ইচ্ছাকৃত বেকারত্ব আইনের চোখে কোনো ছাড় নয়।

আর সন্তানের ক্ষেত্রে তো প্রশ্নই ওঠে না। সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা ও ন্যূনতম জীবনযাপনের দায়িত্ব পিতার ওপর বর্তায়। দুই বছর ধরে সন্তানের পড়াশোনার খরচ না দেওয়া শুধু দায়িত্বহীনতা নয়; এটি সন্তানের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন।

বাস্তবতা হলো, এই ধরনের পরিস্থিতিতে অধিকাংশ নারী একাই লড়েন। অনেক সময় পরিবার পাশে দাঁড়ায় না, সমাজ প্রশ্ন তোলে- “তুমি কী করছ?” কিন্তু প্রশ্ন হওয়া উচিত রাষ্ট্র কী করছে?

নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে হটলাইন আছে, আইন সহায়তা কেন্দ্র আছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। থানায় গেলে অনেক নারী এখনও শুনতে পান- “সংসারের ব্যাপার, মিটমাট করেন।” এই মানসিকতা বদলানো না গেলে আইন কাগজেই রয়ে যাবে।

এখানে শুধু স্বামী বা পরিবার নয়, সমাজও দায় এড়াতে পারে না। কর্মক্ষম একজন পুরুষ দিনের পর দিন দায়িত্বহীনভাবে বসে থাকলে সেটিকে ‘পুরুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’ বলে মেনে নেওয়া হয়; অথচ একজন নারী কাজ না করলে তাকে অলস বলা হয়। এই দ্বৈত মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় সহিংসতা ও বৈষম্য।

ধর্ম, সংস্কৃতি বা সামাজিক রীতিনীতির কোথাও বলা নেই যে একজন পুরুষ তার পরিবারকে অনাহারে রেখে নির্যাতন চালাতে পারবে। বরং সব নৈতিক কাঠামোই দায়িত্ব ও ন্যায়বিচারের কথা বলে।

এই বাস্তবতায় রাষ্ট্র, সমাজ ও আইনি ব্যবস্থার সামনে কয়েকটি স্পষ্ট করণীয় উঠে আসে- প্রথমত, পারিবারিক সহিংসতা আইনের প্রয়োগ জোরদার করতে হবে। থানায় অভিযোগ গ্রহণে গড়িমসি বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভরণপোষণ মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা ট্র্যাক বা ফাস্ট-ট্র্যাক ব্যবস্থা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, নারী ও শিশুর জন্য সরকারি আইন সহায়তা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত ও সহজলভ্য করতে হবে। চতুর্থত, সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হওয়া দরকার। নির্যাতনকে স্বাভাবিক নয়, অপরাধ হিসেবে তুলে ধরতে হবে।

কর্মক্ষম হয়েও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া, স্ত্রীকে মারধর করা এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট করা-এসব কোনোভাবেই ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এগুলো আইন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের সরাসরি প্রশ্ন। একজন নারী যখন স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করে সন্তানকে পড়ান, তখন সেটি কেবল তার ত্যাগের গল্প নয়; এটি রাষ্ট্রের কাছে একটি প্রশ্ন- আইন কি সত্যিই তার পাশে আছে?

সময় এসেছে এই নীরব নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার। আইন আছে, প্রয়োজন শুধু তার যথাযথ প্রয়োগ। অন্যথায় পরিবার ভাঙবে, সমাজ দুর্বল হবে, আর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বেড়ে উঠবে অন্যায়ের ছায়ায়। 

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর