Logo

আইন ও বিচার

ওয়াকফ সম্পত্তি: আমানত না লুটপাট?

Icon

ওসমান গনি

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬, ২২:৫৩

ওয়াকফ সম্পত্তি: আমানত না লুটপাট?

ওয়াকফ সম্পত্তি মুসলিম সমাজের কাছে কেবল একটি আইনগত ধারণা নয়; এটি একটি ধর্মীয় আমানত, সামাজিক ন্যায় ও কল্যাণের ভিত্তি। মসজিদ, মাদরাসা, কবরস্থান, এতিমখানা, দাতব্য হাসপাতাল কিংবা দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ভরণপোষণের জন্য যে সম্পত্তি আল্লাহর নামে উৎসর্গ করা হয়, তা ব্যক্তিগত ভোগ বা লুটপাটের বস্তু হতে পারে না। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে ওয়াকফ সম্পত্তি আজ ব্যাপকভাবে দখল, অবৈধ বিক্রয় ও অপব্যবহারের শিকার।

ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, একবার কোনো সম্পত্তি ওয়াকফ করা হলে তা চিরতরে আল্লাহর মালিকানায় ন্যস্ত হয়। ওয়াকফদাতা, তার উত্তরাধিকারী বা কোনো মোতাওয়াল্লি (ব্যবস্থাপক) সেই সম্পত্তির মালিক নন; তারা কেবল আমানতদার। এই মৌলিক নীতির ওপরই বাংলাদেশের ওয়াকফ আইন দাঁড়িয়ে আছে।

ওয়াকফ ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয় দায়িত্ব পালন করে ওয়াকফ প্রশাসন বাংলাদেশ, যা ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সংস্থা।

ওয়াকফ সম্পত্তি বিক্রয় সাধারণ নিয়মে নিষিদ্ধ। তবে একান্ত প্রয়োজনে, কঠোর শর্তসাপেক্ষে বিক্রয়ের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।

ওয়াকফ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬২ অনুযায়ী- ওয়াকফ সম্পত্তি কোনো অবস্থাতেই মোতাওয়াল্লি বা অন্য কেউ স্বেচ্ছায় বিক্রি করতে পারেন না। সম্পত্তি নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় আয়ের তুলনায় অযৌক্তিক হলে, ওয়াকফের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়লে অনুমোদন প্রক্রিয়া হলো- প্রথমে ওয়াকফ প্রশাসনের লিখিত অনুমোদন, প্রয়োজনে আদালতের অনুমতি, বিক্রয়লব্ধ অর্থ আবার ওয়াকফের বিকল্প সম্পত্তি ক্রয় বা মূল উদ্দেশ্যে ব্যবহার বাধ্যতামূলক। এই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে যে কোনো বিক্রয় আইনগতভাবে বাতিল ও দণ্ডনীয় অপরাধ।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়, জাল দলিল তৈরি করে ওয়াকফ জমি বিক্রি, প্রভাবশালী মহলের দখল, মোতাওয়াল্লিদের যোগসাজশ, ভুয়া মামলা ও দীর্ঘসূত্রতা, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মসজিদের জমিতে বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে, দোকানপাট ভাড়া দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু আয় যাচ্ছে ব্যক্তিগত পকেটে। এতে শুধু আইন লঙ্ঘনই নয়, ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিও চরম অবমাননা করা হচ্ছে।

ওয়াকফ সম্পত্তি আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রয়েছে। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ওয়াকফ সম্পত্তি লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে একাধিক আইনে শাস্তির সুযোগ রয়েছে। ওয়াকফ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬২- অবৈধ বিক্রয় বা দখল বাতিল, মোতাওয়াল্লি অপসারণ, জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান।

দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এর ধারা ৪০৬/৪০৯: বিশ্বাসভঙ্গ, ধারা ৪২০: প্রতারণা, ধারা ৪৬৭-৪৭১: জাল দলিল ও প্রতারণামূলক রেজিস্ট্রি। এসব ধারায় দোষী প্রমাণিত হলে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে।

ভূমি আইন ও দেওয়ানি মামলা দায়ের করে অবৈধ দলিল বাতিল, দখল উদ্ধারের ডিক্রি, ক্ষতিপূরণ আদায় করা যায়। 

আইন থাকা সত্ত্বেও ওয়াকফ সম্পত্তি রক্ষা ব্যর্থ হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ স্পষ্ট।

ওয়াকফ সম্পত্তির পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রেকর্ডের অভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, সাধারণ মানুষের আইনগত অজ্ঞতা। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ওয়াকফ ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই অবস্থা আর নিয়ন্ত্রণে আসবে না। জরুরি কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন বিজ্ঞজনেরা। যেমন- জাতীয় ওয়াকফ ডিজিটাল রেজিস্ট্রি, সব ওয়াকফ সম্পত্তি অনলাইনে তালিকাভুক্ত ও ম্যাপিং, বিশেষ ওয়াকফ ট্রাইব্যুনাল দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির জন্য আলাদা আদালত, মোতাওয়াল্লিদের জবাবদিহি, বার্ষিক অডিট ও সম্পত্তি বিবরণী বাধ্যতামূলক, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে বিশেষ অভিযান, জনসচেতনতা ও ধর্মীয় নেতৃত্বের ভূমিকা, খুতবা, ওয়াজ ও গণমাধ্যমে ওয়াকফ সম্পত্তির গুরুত্ব তুলে ধরা।

ওয়াকফ সম্পত্তি কোনো ব্যক্তির উত্তরাধিকার নয়; এটি একটি জাতির নৈতিক সম্পদ। যে সমাজ আল্লাহর নামে দান করা সম্পত্তি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, সে সমাজ নৈতিক দেউলিয়াত্বের পথে এগোয়। আজ প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দৃঢ়তা এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ।

ওয়াকফ সম্পত্তিকে লুটের বস্তু নয়, কল্যাণের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই হোক রাষ্ট্র ও সমাজের অঙ্গীকার।

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর