নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আইন আছে, প্রয়োগ কতটা কার্যকর?
সোহানা ইয়াসমিন
প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬, ২২:৫৬
দেশে নারী নির্যাতন একটি দীর্ঘদিনের সামাজিক ব্যাধি। সভ্যতা, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পরও নারী আজও নানা ধরনের সহিংসতা, নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার। কখনও পারিবারিক নির্যাতন, কখনও যৌতুকের দাবিতে অত্যাচার, কখনও ধর্ষণ বা যৌন হয়রানি- নারী জীবনের নানা পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে বাংলাদেশ সরকার নারী সুরক্ষা ও নির্যাতন প্রতিরোধে একাধিক বিশেষ আইন প্রণয়ন করেছে।
বাংলাদেশের সংবিধান নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে। সংবিধানের ২৭, ২৮ ও ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা, বৈষম্যহীনতা ও আইনি সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব সমাজে নারী এখনও নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে। তাই শুধু সাংবিধানিক নিশ্চয়তা নয়, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বিশেষ আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।
দেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইন হলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)। এই আইন মূলত ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, অপহরণ, এসিড নিক্ষেপ, পাচারসহ নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সংঘটিত গুরুতর অপরাধ দমনের জন্য প্রণীত হয়েছে।
এই আইনের অধীনে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। ধর্ষণের ফলে ভুক্তভোগীর মৃত্যু হলে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। একইভাবে, যৌন নির্যাতন বা অপহরণের ক্ষেত্রেও কঠোর দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া এই আইনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের ব্যবস্থাও রয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে মামলার দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষ্য প্রমাণের দুর্বলতা এবং সামাজিক চাপের কারণে বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। ফলে অনেক ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।
পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ : নারী নির্যাতনের বড় একটি অংশ ঘটে পরিবারে। স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের দ্বারা মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা সমাজে নিত্যদিনের বিষয়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ প্রণয়ন করা হয়।
এই আইনে শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক ও যৌন নির্যাতনকে পারিবারিক সহিংসতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ভুক্তভোগী নারী আদালতের মাধ্যমে সুরক্ষা আদেশ, বসবাসের অধিকার এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন। এ আইন নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক নারী পারিবারিক মর্যাদা বা সামাজিক লজ্জার ভয়ে আইনের আশ্রয় নিতে চান না। ফলে আইন থাকা সত্ত্বেও এর পূর্ণ সুফল পাওয়া যায় না।
যৌতুক প্রথা বাংলাদেশের সমাজে নারীর ওপর নির্যাতনের একটি বড় কারণ। বিবাহের সময় বা পরবর্তী সময়ে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন, এমনকি হত্যার ঘটনাও ঘটছে। এই সমস্যা মোকাবিলায় যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ কার্যকর রয়েছে।
এই আইনে যৌতুক দাবি করা, গ্রহণ করা বা দেওয়া- সবই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অপরাধের জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। আইনের উদ্দেশ্য হলো সমাজ থেকে যৌতুক প্রথা নির্মূল করা।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, সামাজিক প্রথা ও মানসিকতার কারণে এখনও অনেক পরিবার যৌতুককে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিচ্ছে। ফলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও নানা বাধা তৈরি হচ্ছে।
অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন
এক সময় বাংলাদেশে অ্যাসিড নিক্ষেপ ছিল ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা। নারীদের ওপর প্রতিশোধ বা প্রত্যাখ্যানের কারণে এসিড হামলার ঘটনা ঘটত। এই সমস্যা মোকাবেলায় অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন, ২০০২ এবং এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০২ প্রণয়ন করা হয়।
এই আইনে অ্যাসিড নিক্ষেপের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে অ্যাসিড বিক্রি ও ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে এসিড হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সাইবার হয়রানি :
বর্তমান ডিজিটাল যুগে নারী নির্যাতনের নতুন একটি রূপ হলো অনলাইন হয়রানি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীর ছবি বিকৃত করা, ব্ল্যাকমেইল করা বা অশালীন মন্তব্য করা এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধরনের অপরাধ দমনে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এই আইনে অনলাইনে নারীর সম্মানহানি বা ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহারের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে এ আইনের অপব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্কও রয়েছে।
আইনের প্রয়োগে চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে নারী সুরক্ষায় আইনগত কাঠামো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হলেও বাস্তব প্রয়োগে নানা সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নারী সামাজিক ভয় বা লজ্জার কারণে অভিযোগ করতে চান না। দ্বিতীয়ত, মামলা পরিচালনায় দীর্ঘসূত্রতা ও বিচার বিলম্ব একটি বড় সমস্যা।
এছাড়া তদন্তের মান, সাক্ষীর নিরাপত্তা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংবেদনশীলতার অভাবও বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। ফলে অনেক অপরাধী শাস্তি এড়িয়ে যায়, যা সমাজে নেতিবাচক বার্তা দেয়।
শুধু আইন প্রণয়ন করলেই নারী নির্যাতন বন্ধ হবে না। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা এবং মানসিকতার পরিবর্তন। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নারীকে সম্মান করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
বিশেষ করে শিক্ষা ব্যবস্থায় লিঙ্গ সমতা ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকে নারী নির্যাতনের ঘটনা তুলে ধরার পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
নারী নির্যাতন প্রতিরোধে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও দক্ষ ও সংবেদনশীল হতে হবে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে ভুক্তভোগী নারীদের জন্য আইনি সহায়তা, নিরাপদ আশ্রয় ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। স্থানীয় প্রশাসন, এনজিও এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
দেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে একাধিক শক্তিশালী আইন রয়েছে। কিন্তু আইন থাকা সত্ত্বেও যদি তার যথাযথ প্রয়োগ না হয়, তবে তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। নারী সমাজের অর্ধেক শক্তি। তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। অতএব নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, বিচার ব্যবস্থার সংস্কার এবং রাষ্ট্রের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য। তাহলেই কেবল একটি নিরাপদ, মানবিক ও সমতাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
বিকেপি/এমএম

