ফলজ গাছ কেটে কৃষকের সর্বনাশ অপরাধীর শাস্তিতে কোন ছাড় নয়
রফিকুল ইসলাম টিপু
প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬, ২৩:০১
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। এ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি মূলত কৃষি ও কৃষকের ওপর নির্ভরশীল। কৃষকের জমি, ফসল, গবাদিপশু কিংবা ফলজ গাছ এসবই তার জীবিকার প্রধান অবলম্বন। কিন্তু গ্রামবাংলার অনেক এলাকায় পূর্ব শত্রুতা, জমিজমা নিয়ে বিরোধ বা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জেরে কৃষকের ফলজ গাছ কেটে ফেলার ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়। এতে শুধু একটি গাছ নষ্ট হয় না; বরং একটি পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক অপরাধ হিসেবেও বিবেচিত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশে অনেক কৃষক বছরের পর বছর ধরে পরিশ্রম করে ফলজ গাছ বড় করেন। একটি আম, কাঁঠাল, লিচু বা নারিকেল গাছ ফল দিতে অনেক সময় ৮ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত লেগে যায়। সেই গাছ যখন ফলন দিতে শুরু করে, তখন তা কৃষকের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হয়। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি পূর্ব শত্রুতার কারণে সেই গাছ কেটে ফেলে, তাহলে কৃষক একদিকে তাৎক্ষণিক ক্ষতির শিকার হন, অন্যদিকে ভবিষ্যতের আয় থেকেও বঞ্চিত হন। তাই ফলজ গাছ কেটে ফেলা নিছক দুষ্টামি বা সামান্য ক্ষতি নয়; এটি এক ধরনের পরিকল্পিত অর্থনৈতিক নাশকতা।
গ্রামাঞ্চলে জমি নিয়ে বিরোধ বা পারিবারিক দ্বন্দ্ব অনেক পুরোনো বাস্তবতা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রতিপক্ষকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য রাতের অন্ধকারে ফলজ গাছ কেটে ফেলা হয়। কখনও আবার বাগান ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এসব ঘটনার পেছনে মূলত প্রতিহিংসা কাজ করে। কিন্তু এর ফলে যে ক্ষতি হয়, তা শুধু একজন কৃষকের নয়; বরং স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিরও ক্ষতি।
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী অন্যের সম্পত্তি নষ্ট করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর বিভিন্ন ধারায় এই অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে। বিশেষ করে ধারা ৪২৫ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের সম্পত্তির ক্ষতি করেন, তাহলে তা “মিসচিফ” বা দুষ্টামূলক ক্ষতি হিসেবে গণ্য হবে। আর ধারা ৪২৭ অনুযায়ী, যদি সেই ক্ষতির পরিমাণ ৫০ টাকার বেশি হয়, তাহলে অপরাধীর সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
ফলজ গাছ কেটে ফেলার ঘটনায় এই ধারা প্রযোজ্য হয়। কারণ একটি ফলজ গাছের আর্থিক মূল্য অনেক বেশি। অনেক সময় একটি পূর্ণবয়স্ক আম বা লিচু গাছের বাজারমূল্য কয়েক হাজার থেকে কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ফলে গাছ কেটে ফেলা মানে কৃষকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ধ্বংস করা।
এছাড়া ধারা ৪৩০ অনুযায়ী, কৃষিজ সম্পদের ক্ষতি করার মতো কর্মকাণ্ডের জন্য আরও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কৃষিজ উৎপাদন নষ্ট করার উদ্দেশ্যে ক্ষতি করে, তাহলে তা গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
শুধু ফৌজদারি আইনের দিক থেকেই নয়, দেওয়ানি আইন অনুযায়ীও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন। আদালতে দেওয়ানি মামলা করে তিনি তার ক্ষতির আর্থিক প্রতিকার চাইতে পারেন। আদালত প্রমাণের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ আদায়ের নির্দেশ দিতে পারে।
তবে বাস্তব সমস্যা হলো- গ্রামাঞ্চলের অনেক কৃষক এসব আইনি বিষয় সম্পর্কে সচেতন নন। ফলে তারা অনেক সময় আইনের আশ্রয় নিতে পারেন না। আবার সামাজিক চাপে অনেক সময় তারা মামলা করতে সাহস পান না। এর সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।
এই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে প্রথমেই প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা। গ্রাম সমাজে এখনো অনেক ক্ষেত্রে সালিশ বা আপসের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের সম্পত্তি ধ্বংস করার মতো অপরাধের ক্ষেত্রে শুধু সামাজিক সালিশ যথেষ্ট নয়; বরং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশাসনেরও এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখা জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, পুলিশে অভিযোগ করা হলেও যথাযথ তদন্ত হয় না বা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে ভুক্তভোগী কৃষক ন্যায়বিচার পান না। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ ধরনের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে।
এছাড়া স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগকেও সচেতন হতে হবে। কৃষকের ফলজ গাছ বা বাগান ধ্বংস হলে তার আর্থিক ক্ষতি নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকা উচিত। এতে কৃষক অন্তত আংশিকভাবে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে ফলজ গাছের গুরুত্ব অনেক। শুধু পারিবারিক আয়ের জন্য নয়, দেশের পুষ্টি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ফল উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সরকার বিভিন্ন সময় ফলের বাগান বাড়ানোর জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করছে। এই প্রেক্ষাপটে যদি প্রতিহিংসার কারণে ফলজ গাছ কেটে ফেলার ঘটনা ঘটে, তাহলে তা কৃষি উন্নয়নের পথেও বাধা সৃষ্টি করবে।
গণমাধ্যমেরও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গ্রামে ফলজ গাছ কেটে কৃষকের ক্ষতি করার ঘটনাগুলো সামনে আনতে হবে। এতে একদিকে যেমন প্রশাসনের নজর বাড়বে, অন্যদিকে সমাজেও সচেতনতা তৈরি হবে।
একই সঙ্গে আইনের শাস্তির বিষয়টি জনগণের সামনে তুলে ধরা জরুরি। অনেকেই মনে করেন, গাছ কেটে ফেলা তেমন বড় অপরাধ নয়। কিন্তু আইন অনুযায়ী এটি গুরুতর অপরাধ। তাই এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
অপরাধ প্রতিরোধে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য, চেয়ারম্যান কিংবা গ্রাম্য নেতাদের উচিত বিরোধের আগেই সমাধান করার চেষ্টা করা। যদি বিরোধের কারণে সহিংসতার আশঙ্কা থাকে, তাহলে প্রশাসনকে অবহিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আইনের কার্যকর প্রয়োগ। যদি দেখা যায় যে গাছ কেটে ফেলার মতো অপরাধের জন্য অপরাধীরা কঠোর শাস্তি পাচ্ছে, তাহলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা অনেকটাই কমে যাবে।
কৃষক আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি। তাদের পরিশ্রমের ফলেই দেশের মানুষ খাদ্য পায়। তাই কৃষকের সম্পদ রক্ষা করা শুধু ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজেরও দায়িত্ব।
পূর্ব শত্রুতার জেরে ফলজ গাছ কেটে কৃষকের সর্বনাশ করার মতো ঘটনা কোনো সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না। এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ন্যায়বিচার দিতে হবে।
অন্যথায় কৃষকের নিরাপত্তাহীনতা বাড়বে এবং কৃষি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই এখনই সময় কৃষকের সম্পদ রক্ষায় আইনকে আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করার। তাহলেই গ্রামবাংলার কৃষক নিরাপদ থাকবে এবং দেশের কৃষি অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
বিকেপি/এমএম

