Logo

আইন ও বিচার

এসিড সন্ত্রাস রোধে আইন প্রয়োগ ও আমদানিতে কড়া নজরদারি জরুরী

Icon

বায়েজিদ তাশরীক

প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬, ২২:৫৭

এসিড সন্ত্রাস রোধে আইন প্রয়োগ ও আমদানিতে কড়া নজরদারি জরুরী

বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ রূপগুলোর মধ্যে এসিড সন্ত্রাস একটি নির্মম ও অমানবিক অপরাধ। সামান্য ব্যক্তিগত বিরোধ, প্রেমে প্রত্যাখ্যান, জমিজমা নিয়ে দ্বন্দ্ব কিংবা পারিবারিক কলহ এসব তুচ্ছ কারণেই অনেক সময় নারী ও শিশুদের ওপর এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এই নৃশংস অপরাধে শুধু একজন মানুষের শরীরই পুড়ে যায় না, ধ্বংস হয়ে যায় তার স্বাভাবিক জীবন, আত্মসম্মান ও ভবিষ্যৎ। তাই এসিড সন্ত্রাস প্রতিরোধে আইন প্রয়োগ আরও কঠোর করা এবং এসিডের উৎপাদন, আমদানি ও বিপণনে কড়া নজরদারি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশে এক সময় এসিড সন্ত্রাস ছিল উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়া একটি অপরাধ। বিশেষ করে নব্বই দশকের শেষভাগ এবং ২০০০ সালের শুরুর দিকে দেশে এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, নারী ও কিশোরীরা ছিল এই অপরাধের প্রধান শিকার। প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, বিয়েতে অস্বীকৃতি বা যৌতুক সংক্রান্ত বিরোধের জেরে অনেক নারীকে নির্মমভাবে এসিড হামলার শিকার হতে হয়েছে। ফলে এ ধরনের অপরাধ সামাজিকভাবে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ২০০২ সালে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন করে- এসিড অপরাধ দমন আইন, ২০০২ এবং অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০২। এই দুটি আইন প্রণয়নের ফলে দেশে এসিড সন্ত্রাস দমনে একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো তৈরি হয়। আইনের কঠোরতা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে পরবর্তী সময়ে এসিড হামলার ঘটনা অনেকাংশে কমে আসে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে আবারও এসিড ব্যবহারের ঘটনা সামনে আসছে, যা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

এসিড অপরাধ দমন আইনের অধীনে এসিড নিক্ষেপের মতো অপরাধের জন্য অত্যন্ত কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। এই আইনে বলা হয়েছে, যদি এসিড হামলার ফলে কারও মৃত্যু ঘটে, তাহলে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। এছাড়া গুরুতর শারীরিক ক্ষতির ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ডের বিধানও রয়েছে। আইনটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও রেখেছে।

এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল, অপরাধীদের কঠোর শাস্তির মাধ্যমে এসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শক্ত বার্তা দেওয়া। বাস্তবে দেখা গেছে, আইন প্রণয়নের পর এসিড হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্যমতে, ২০০২ সালের আগে দেশে বছরে শতাধিক এসিড হামলার ঘটনা ঘটত। আইন প্রণয়নের পর সেই সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

তবে আইন থাকা সত্ত্বেও কেন এখনও এসিড হামলার ঘটনা ঘটছে? এর একটি বড় কারণ হলো এসিডের সহজলভ্যতা। শিল্পকারখানা, স্বর্ণকারের দোকান, ব্যাটারি মেরামতের দোকানসহ বিভিন্ন কাজে এসিড ব্যবহৃত হয়। অনেক ক্ষেত্রেই এসব এসিড নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বিক্রি হচ্ছে। ফলে অসৎ উদ্দেশ্যে কেউ সহজেই এসিড সংগ্রহ করতে পারছে।

এই সমস্যার সমাধানে এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০২ প্রণয়ন করা হয়। এই আইনে এসিডের উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিক্রির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, লাইসেন্স ছাড়া কেউ এসিড আমদানি বা বিক্রি করতে পারবে না। একইভাবে এসিড ক্রয়-বিক্রির ক্ষেত্রে যথাযথ রেজিস্টার সংরক্ষণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে এই নিয়মগুলো যথাযথভাবে মানা হয় না। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনও অবাধে এসিড বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যায়। লাইসেন্স ছাড়া দোকানেও এসিড পাওয়া যায়, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ফলে অপরাধীরা সহজেই এসিড সংগ্রহ করে অপরাধ সংঘটনের সুযোগ পাচ্ছে।

এসিড সন্ত্রাসের সবচেয়ে বড় শিকার নারী ও শিশুরা। সমাজে নারীর প্রতি বিদ্বেষ, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং প্রতিশোধপরায়ণ মনোভাব অনেক সময় এই অপরাধকে উসকে দেয়। প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেই একজন নারীকে এসিড নিক্ষেপের মতো ভয়াবহ শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা সভ্য সমাজে কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এসিড হামলার শিকার ব্যক্তিদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। তাদের অনেকেই স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারান, মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ অকার্যকর হয়ে পড়ে। চিকিৎসা, প্লাস্টিক সার্জারি ও পুনর্বাসনের জন্য দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজ থেকেও তারা অবহেলার শিকার হন।

এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া নয়, বরং ভুক্তভোগীদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সামাজিক পুনর্গঠনের ব্যবস্থা করা। সরকার ইতিমধ্যে এসিড আক্রান্তদের চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তবুও আরও সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

এসিড সন্ত্রাস প্রতিরোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, মামলার তদন্ত দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিলম্বিত হয়। ফলে বিচার প্রক্রিয়াও দীর্ঘ হয়। এই পরিস্থিতি অপরাধ দমনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

এছাড়া এসিডের আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। লাইসেন্স ছাড়া এসিড বিক্রি করলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত এসিডের হিসাবও নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন।

সচেতনতা বৃদ্ধিও এসিড সন্ত্রাস প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীকে সম্মান করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

গণমাধ্যমের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসিড সন্ত্রাসের ঘটনা তুলে ধরা, ভুক্তভোগীদের গল্প প্রকাশ করা এবং আইনি সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে গণমাধ্যম সমাজকে সচেতন করতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনের গাফিলতি থাকলে তা প্রকাশের মাধ্যমেও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

এসিড সন্ত্রাস শুধু একটি অপরাধ নয়; এটি মানবতার বিরুদ্ধে এক নির্মম আঘাত। একটি সভ্য সমাজে এমন নৃশংসতা কখনও সহ্য করা যায় না। তাই এসিড অপরাধ দমনে আইনকে আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং এসিডের উৎপাদন, আমদানি ও বিপণনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।

নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। এসিড সন্ত্রাসের মতো অপরাধ নির্মূল করতে হলে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, প্রশাসনিক তৎপরতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এসিড সন্ত্রাস দমনে আন্তর্জাতিকভাবে একটি ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করেছে। এখন সেই সাফল্য ধরে রাখতে হলে নতুন করে সতর্ক হতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ, আমদানিতে কড়া নজরদারি এবং সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে এসিড সন্ত্রাসকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা সম্ভব যদি আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে উদ্যোগী হই।

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর