Logo

আইন ও বিচার

ধর্ম পরিবর্তন করলে উত্তরাধিকার থাকে না!

Icon

সোহানা ইয়াসমিন

প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬, ২২:২৯

ধর্ম পরিবর্তন করলে উত্তরাধিকার থাকে না!

দেশে উত্তরাধিকার আইন মূলত ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ মুসলমানদের জন্য মুসলিম ফারায়েজ আইন, হিন্দুদের জন্য হিন্দু ব্যক্তিগত আইন এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য তাদের নিজস্ব পারিবারিক আইন প্রযোজ্য। এই প্রেক্ষাপটে কোনো ব্যক্তি যদি তার ধর্ম পরিবর্তন করেন, তবে কি তিনি তার পিতার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার দাবি করতে পারবেন? বিশেষ করে যখন একজন হিন্দু সন্তান ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন বা অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করেন, তখন তার পিতার সম্পত্তির ওপর অধিকার নিয়ে আইনি জটিলতা দেখা দেয়।

প্রথমে বাংলাদেশের উত্তরাধিকার আইনের মূল কাঠামো এবং আদালতের বিভিন্ন রায় বা নজির বিশ্লেষণ করা জরুরি।

ধর্মভিত্তিক উত্তরাধিকার আইন : দেশে মুসলমানদের উত্তরাধিকার নির্ধারিত হয় মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এবং ইসলামি ফারায়েজ নীতির ভিত্তিতে। অন্যদিকে হিন্দুদের সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রচলিত হিন্দু ব্যক্তিগত আইন কার্যকর থাকে, যা ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসছে।

হিন্দু আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো- হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করলে অনেক ক্ষেত্রে সেই ব্যক্তি হিন্দু পরিবারে উত্তরাধিকার দাবি করার ক্ষেত্রে অযোগ্য হয়ে পড়তে পারেন। তবে এই নীতি সব ক্ষেত্রে একভাবে প্রযোজ্য নয়; আদালতের ব্যাখ্যা ও বিভিন্ন পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে বিষয়টি নির্ধারিত হয়।

ধর্ম পরিবর্তন ও উত্তরাধিকার: আইনি নীতি

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ- ১. ব্যক্তি কখন ধর্ম পরিবর্তন করেছেন, ২. পিতা বা সম্পত্তির মালিক কখন মারা গেছেন, ৩. সম্পত্তির প্রকৃতি কী- পৈতৃক নাকি স্বঅর্জিত?  যদি কোনো ব্যক্তি তার পিতা জীবিত থাকা অবস্থায় ধর্ম পরিবর্তন করেন এবং পিতা হিন্দু অবস্থায় মারা যান, তবে হিন্দু আইনের অধীনে সেই ব্যক্তির উত্তরাধিকার পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

আদালতের গুরুত্বপূর্ণ নজির :

বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের বিভিন্ন আদালত ধর্ম পরিবর্তন ও উত্তরাধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

১. Abdul Hakim vs Mst. Noor Banu মামলা :  এই মামলায় আদালত মত দেন যে, হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করা ব্যক্তির উত্তরাধিকার দাবি বিচার করার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগত আইন বিবেচনা করতে হবে। যদি সম্পত্তির মালিক হিন্দু অবস্থায় মারা যান, তবে তার সম্পত্তি হিন্দু আইনের অধীনেই বণ্টিত হবে।

এই মামলার পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, ধর্ম পরিবর্তন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার বাতিল করে না, তবে ব্যক্তিগত আইনের বিধান অনুসারে সিদ্ধান্ত দিতে হবে।

২.Mst. Rajkumari vs Mst. Bibi Rahima মামলা :  এই মামলায় আদালত বলেন, হিন্দু পরিবারে জন্ম নেওয়া ব্যক্তি যদি অন্য ধর্ম গ্রহণ করেন, তবে তিনি হিন্দু উত্তরাধিকার ব্যবস্থার অধীনে দাবি করতে পারবেন কি না—তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট আইন ও পারিবারিক পরিস্থিতির ওপর।

আদালত আরও বলেন, ধর্ম পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে উত্তরাধিকার সম্পূর্ণ বাতিল করা সবসময় ন্যায়সংগত নয়; বরং প্রতিটি মামলার বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে।

৩. উপমহাদেশীয় বিচারব্যবস্থার প্রভাব :  দেশের বিচারব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে ব্রিটিশ ভারত ও পাকিস্তান আমলের রায়ও প্রাসঙ্গিক হিসেবে বিবেচিত হয়। এসব রায়ে দেখা যায়, ধর্ম পরিবর্তনের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি তার পূর্ব ধর্মের পারিবারিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, বিশেষ করে যখন সম্পত্তি হিন্দু আইনের অধীন ছিল।

তবে একই সঙ্গে কিছু রায়ে বলা হয়েছে—যদি ধর্ম পরিবর্তনের পরও পারিবারিক সম্পর্ক বজায় থাকে এবং অন্য উত্তরাধিকারীরা আপত্তি না করেন, তাহলে সম্পত্তি পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।

উইল থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন : 

যদি পিতা জীবিত অবস্থায় উইল করে কোনো সম্পত্তি ধর্ম পরিবর্তন করা সন্তানের নামে দিয়ে যান, তাহলে সেই উইল কার্যকর হতে পারে। কারণ উইলের মাধ্যমে সম্পত্তি দেওয়া উত্তরাধিকার আইনের বাইরে একটি স্বাধীন সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

বাংলাদেশে উইল সংক্রান্ত বিধান রয়েছে উইল আইন ১৮৭০-এ। এই আইনের অধীনে একজন ব্যক্তি তার সম্পত্তি যে কাউকে উইল করে দিতে পারেন।

জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি হস্তান্তর : 

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পিতা জীবিত অবস্থায় সন্তানকে দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তি দিয়ে দেন। সে ক্ষেত্রে ধর্ম পরিবর্তন কোনো বাধা সৃষ্টি করে না। কারণ এটি উত্তরাধিকার নয়, বরং জীবদ্দশায় সম্পত্তি হস্তান্তর।

দেশের সমাজে ধর্ম পরিবর্তন এখনও একটি সংবেদনশীল বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক বিরোধ বা সামাজিক চাপের কারণে ধর্ম পরিবর্তন করা সন্তানকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। ফলে এসব বিষয় আদালতে গড়ায় এবং দীর্ঘ আইনি লড়াই শুরু হয়। এতে পারিবারিক সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে পড়ে।

আইনজীবীদের মতে, ধর্ম পরির্তনের কারণে উত্তরাধিকার সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যায়- এমন কোনো একক নিয়ম নেই। বরং প্রতিটি মামলার বাস্তব পরিস্থিতি, সম্পত্তির প্রকৃতি, পিতার ধর্মীয় অবস্থা এবং প্রযোজ্য ব্যক্তিগত আইন বিবেচনা করে আদালত সিদ্ধান্ত দেন।

তাই এ ধরনের ক্ষেত্রে সরাসরি আইনি পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যদি কেউ ধর্ম পরিবর্তনের পর পিতার সম্পত্তি নিয়ে সমস্যায় পড়েন, তাহলে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে- পারিবারিকভাবে সমঝোতার চেষ্টা করা, সম্পত্তির দলিল ও রেকর্ড যাচাই করা, উইল আছে কি না তা খতিয়ে দেখা, প্রয়োজনে দেওয়ানি আদালতে উত্তরাধিকার মামলা করা।

দেশে ধর্ম পরিবর্তন করলে পিতার সম্পত্তি পাওয়া যাবে কি না- এটি নির্ভর করে ব্যক্তিগত আইন, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং আদালতের ব্যাখ্যার ওপর। তবে সাধারণভাবে বলা যায়, যদি কোনো ব্যক্তি হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তার পিতা হিন্দু অবস্থায় মারা যান, তাহলে হিন্দু ব্যক্তিগত আইনের কারণে উত্তরাধিকার পাওয়া কঠিন হতে পারে। কিন্তু উইল, জীবদ্দশায় সম্পত্তি হস্তান্তর বা পারিবারিক সমঝোতার মাধ্যমে অনেক সময় সেই বাধা অতিক্রম করা সম্ভব।  ধর্ম পরিবর্তন শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় নয়; এটি অনেক সময় আইনি ও পারিবারিক জটিলতারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আইনগত দিকটি সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর