দেশে মাঝে মধ্যেই এমন কিছু ঘটনা সামনে আসে যা কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে না, বরং সমাজের নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর সংকটকেও সামনে নিয়ে আসে। তেমনই এক ভয়াবহ ও অমানবিক অপরাধ হলো লাশ চুরি। হাসপাতালের মর্গ, কবরস্থান কিংবা দাফনের আগ মুহূর্তে মৃতদেহ চুরি হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা সমাজকে নাড়িয়ে দেয়। একটি মৃতদেহও আজ নিরাপদ নয়। এই লাশ চুরির ঘটনায় দায় কার- আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবহেলা, প্রশাসনিক দুর্বলতা, নাকি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়?
দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাঝেমধ্যে লাশ চুরির খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পায়। কখনো হাসপাতালের মর্গ থেকে, কখনো কবরস্থান থেকে আবার কখনো অজ্ঞাত লাশ দাফনের আগেই নিখোঁজ হয়ে যায়। এসব ঘটনার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে- অপরাধ গোপন করা, অবৈধ অঙ্গব্যবসা, তান্ত্রিক কার্যকলাপ কিংবা কোনো ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লাশ চুরি কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি মানবিক মর্যাদার বিরুদ্ধে এক নির্মম আঘাত। মৃত্যুর পরও একজন মানুষের দেহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা সভ্য সমাজের মৌলিক নীতি। কিন্তু যখন সেই মৃতদেহই চুরি হয়ে যায়, তখন তা শুধু আইনগত অপরাধ নয়, বরং সামাজিক মূল্যবোধেরও চরম অবক্ষয়ের প্রতীক।
আইনের দৃষ্টিতে লাশ চুরি : দেশের আইনে মৃতদেহ চুরি বা অপমান করার বিষয়টি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক বিধান রয়েছে বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০-এ। এই আইনের ২৯৭ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি কবরস্থান বা দাফনের স্থান অবমাননা করে বা মৃতদেহের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ করে, তবে তা দণ্ডনীয় অপরাধ। এ অপরাধে কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
এছাড়া কোনো মৃতদেহ অপসারণ করে প্রমাণ নষ্ট করা হলে সেটি আরও গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ফৌজদারি আইনের অন্যান্য ধারাও প্রযোজ্য হতে পারে।
মৃতদেহের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বাংলাদেশ পুলিশ এবং হাসপাতালের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে মর্গ বা কবরস্থানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। ফলে অপরাধীরা সহজেই সুযোগ পেয়ে যায়।
হাসপাতালের মর্গ: নিরাপত্তাহীনতার বড় কেন্দ্র
বাংলাদেশের বেশিরভাগ সরকারি হাসপাতালের মর্গের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই, সিসিটিভি নেই, এমনকি পর্যাপ্ত প্রহরীরও অভাব রয়েছে। রাতের বেলায় মর্গ প্রায়ই অরক্ষিত অবস্থায় থাকে।
অনেক ক্ষেত্রে মর্গে রাখা অজ্ঞাতনামা লাশ দীর্ঘদিন পড়ে থাকে। এসব লাশের সঠিক রেকর্ড সংরক্ষণ বা তদারকি না থাকলে সেগুলো হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে শুধু আইনি জটিলতাই সৃষ্টি হয় না, বরং অপরাধ তদন্তেও সমস্যা দেখা দেয়।
জানতে চাইলে একাধিক বিশেষজ্ঞ গতকাল বাংলাদেশের খবরকে বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মর্গ ব্যবস্থাপনাকে আরও সুরক্ষিত করা জরুরি। ডিজিটাল রেকর্ড, বায়োমেট্রিক নিয়ন্ত্রণ এবং সিসিটিভি নজরদারি চালু করা হলে অনেক সমস্যাই কমে আসতে পারে।
কবরস্থানেও নিরাপত্তা সংকট
লাশ চুরির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হলো কবরস্থান। অনেক এলাকায় কবরস্থানের কোনো সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। রাতে প্রহরী থাকে না, আলো নেই, সীমানা প্রাচীরও অনেক সময় ভাঙা থাকে। ফলে অসাধু ব্যক্তিরা সহজেই সেখানে প্রবেশ করতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নতুন দাফন করা লাশ কবর খুঁড়ে তুলে নেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনার পেছনে নানা গুজব ও কুসংস্কারও কাজ করে। কেউ কেউ তান্ত্রিক বা অলৌকিক বিশ্বাসের কারণে এমন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
এ ধরনের ঘটনা শুধু মৃতের পরিবারের জন্যই নয়, পুরো সমাজের জন্যই গভীর মানসিক আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, লাশ চুরির পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। অপরাধ গোপন করার উদ্দেশ্যে কোনো হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ মুছে ফেলতে লাশ সরিয়ে ফেলা হতে পারে। অবৈধ অঙ্গব্যবসার সঙ্গে জড়িত চক্রও কখনো কখনো মৃতদেহ চুরি করতে পারে বলে সন্দেহ করা হয়।
কুসংস্কার ও তান্ত্রিক কার্যকলাপের জন্যও কিছু মানুষ লাশ চুরি করে থাকে। যদিও এসব ঘটনার প্রমাণ সবসময় পাওয়া যায় না, তবুও বিভিন্ন সময়ে এমন অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থাও এই অপরাধকে উৎসাহিত করে। যেখানে নিরাপত্তা নেই, সেখানে অপরাধীরা সহজেই সুযোগ পায়।
লাশ চুরির মতো ঘটনায় এককভাবে কাউকে দায়ী করা কঠিন হলেও কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে সামনে আসে। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা একটি বড় কারণ। হাসপাতালের মর্গ বা কবরস্থানের যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির ঘাটতিও প্রশ্নের জন্ম দেয়। কোনো এলাকায় যদি বারবার এমন ঘটনা ঘটে, তবে তা প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
তৃতীয়ত, সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একজন মানুষ মৃত্যুর পরও তার মর্যাদা রক্ষা করা সমাজের দায়িত্ব। কিন্তু যখন কিছু মানুষ সেই মর্যাদাকেই লঙ্ঘন করে, তখন তা সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
লাশ চুরির মতো অপরাধ প্রতিরোধ করতে হলে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
প্রথমত, হাসপাতালের মর্গগুলোকে আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। সিসিটিভি ক্যামেরা, ডিজিটাল রেকর্ড এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, কবরস্থানের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। সীমানা প্রাচীর, পর্যাপ্ত আলো এবং রাতের প্রহরী নিশ্চিত করা গেলে অনেক অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ বিষয়ে আরও সক্রিয় হতে হবে। লাশ চুরির ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও দোষীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অন্যরা এ ধরনের অপরাধে জড়াতে ভয় পাবে। চতুর্থত, কুসংস্কার ও অজ্ঞতার বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদেরও এ বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী গতকাল বাংলাদেশের খবরকে বলেন, একটি সভ্য সমাজে জীবিত মানুষের মতো মৃত মানুষেরও মর্যাদা রয়েছে। সেই মর্যাদা রক্ষা করা শুধু আইনের দায়িত্ব নয়, বরং পুরো সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। লাশ চুরির মতো ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সিনিয়র অ্যাডভোকেট পিকে আব্দুর রব বলেন, লাশ চুরি কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি মানবিকতা, নৈতিকতা এবং আইনের শাসনের বিরুদ্ধে এক গুরুতর চ্যালেঞ্জ। এই সমস্যার সমাধান করতে হলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রশাসনিক দক্ষতা, সামাজিক সচেতনতা এবং মানবিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ প্রয়োজন।
রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং সমাজ সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ মৃত্যুর পরও একজন মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা একটি সভ্য জাতির পরিচয়। আর সেই মর্যাদা যদি আমরা রক্ষা করতে না পারি, তবে আমাদের সভ্যতার দাবিও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
বিকেপি/এমএম

