Logo

আইন ও বিচার

নেই আইনের প্রয়োগ

নিষিদ্ধ ই-সিগারেট ও ভ্যাপে ভাসছে তরুণরা

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬, ২২:১৬

নিষিদ্ধ ই-সিগারেট ও ভ্যাপে ভাসছে তরুণরা

দেশে তামাকজাত পণ্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা যতই বাড়ুক না কেন, নতুন রূপে নেশাজাতীয় পণ্যের বিস্তার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে ই-সিগারেট বা ভ্যাপ নামে পরিচিত ইলেকট্রনিক ধূমপান সামগ্রী এখন তরুণ-তরুণীদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এ নেশায় জড়িয়ে পড়ছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও সামাজিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। অথচ সরকার ইতোমধ্যে ই-সিগারেট ও ভ্যাপের আমদানি, উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তবুও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরের দোকান, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে এসব পণ্য। আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগের অভাবে তরুণ প্রজন্ম ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ই-সিগারেটকে অনেকেই সাধারণ সিগারেটের বিকল্প বা কম ক্ষতিকর মনে করলেও বাস্তবে এটি মোটেও নিরাপদ নয়। ই-সিগারেটে ব্যবহৃত তরল পদার্থে নিকোটিনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা মানুষের ফুসফুস, হৃদযন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরুণদের মস্তিষ্কের বিকাশ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই নিকোটিনের সংস্পর্শে এলে তা দীর্ঘমেয়াদে আসক্তি, মানসিক সমস্যা ও শারীরিক জটিলতার কারণ হতে পারে।

বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০০৫ সালে প্রণীত তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ এবং পরবর্তীতে সংশোধিত বিধান অনুযায়ী ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের প্রচার-প্রচারণা ও ব্যবহারের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সরকার সাম্প্রতিক সময়ে ই-সিগারেট ও ভ্যাপের আমদানি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তও নিয়েছে। এর লক্ষ্য ছিল তরুণ প্রজন্মকে নিকোটিন আসক্তি থেকে রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো- আইন থাকা সত্ত্বেও বাজারে এসব পণ্যের সহজলভ্যতা রোধ করা যাচ্ছে না।

রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠয়ের আশপাশে গেলে দেখা যায়, কিছু দোকানে গোপনে আবার কোথাও প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে ভ্যাপ ডিভাইস ও ফ্লেভারযুক্ত ই-সিগারেট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে এসব পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। অনলাইন ডেলিভারির মাধ্যমে সহজেই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে ভ্যাপ। এতে করে আইনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো ভ্যাপ পণ্যের বিপণনে তরুণদের আকৃষ্ট করতে নানা ধরনের ফলের স্বাদ, সুগন্ধ ও আকর্ষণীয় ডিজাইন ব্যবহার করা হয়। চকলেট, স্ট্রবেরি, পুদিনা বা আমের স্বাদের মতো ফ্লেভার তরুণদের কাছে বিষয়টিকে ‘স্টাইল’ বা ‘ফ্যাশন’ হিসেবে উপস্থাপন করছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী প্রথমে কৌতূহলবশত শুরু করলেও ধীরে ধীরে নিকোটিন আসক্ত হয়ে পড়ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ই-সিগারেটের ক্ষতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে পর্যাপ্ত সচেতনতা নেই। অনেকেই মনে করেন এটি সাধারণ সিগারেটের তুলনায় নিরাপদ। কিন্তু বাস্তবে ই-সিগারেটে ব্যবহৃত নিকোটিন ও রাসায়নিক পদার্থ শরীরে একই ধরনের কিংবা আরও বেশি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে ই-সিগারেট ব্যবহারের কারণে ফুসফুসের জটিল রোগের ঘটনাও দেখা গেছে।

দেশে তরুণদের মধ্যে মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় সামাজিক সমস্যা। ভ্যাপ বা ই-সিগারেট সেই সমস্যাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কারণ এটি দেখতে আধুনিক গ্যাজেটের মতো হওয়ায় অনেক সময় শিক্ষক-অভিভাবকও সহজে বুঝতে পারেন না যে শিক্ষার্থীরা ধূমপান করছে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরেও গোপনে এসব ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুর্বলতার বিষয়টি এখানে স্পষ্ট। দেশে যখন কোনো পণ্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়, তখন তার আমদানি, উৎপাদন ও বিক্রি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সীমান্তপথে কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এসব পণ্য দেশে ঢুকে পড়ছে। বাজারে নিয়মিত অভিযান ও তদারকি না থাকায় ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছে।

এখানে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভোক্তা অধিকার সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে ভ্যাপ ও ই-সিগারেট বিক্রি বন্ধ করতে হবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যারা এসব পণ্য বিক্রি করছে তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্তে কড়া নজরদারি বাড়াতে হবে যাতে এসব পণ্যের অবৈধ আমদানি বন্ধ করা যায়।

তবে শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; সচেতনতা বৃদ্ধি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তামাকবিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচি জোরদার করা দরকার। শিক্ষার্থীদের জানাতে হবে ই-সিগারেটের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নিকোটিন আসক্তির ক্ষতিকর দিকগুলো। পরিবার থেকেও এ বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। অনেক সময় অভিভাবকরা বুঝতেই পারেন না যে তাদের সন্তান ভ্যাপ ব্যবহার করছে।

গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়ায় ই-সিগারেটের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। সামাজিক আন্দোলন তৈরি না হলে এই নতুন ধরনের নেশা রোধ করা কঠিন হবে।

বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে ই-সিগারেট নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ করছে। কোথাও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, আবার কোথাও কড়া নিয়ন্ত্রণের আওতায় রাখা হয়েছে।

সরকার যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তা অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত কার্যকর না হলে তার সুফল পাওয়া যাবে না।

তাই ই-সিগারেট ও ভ্যাপের অবাধ বিস্তার রোধে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর অভিযান, অনলাইন বিক্রি বন্ধ, সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি এবং ব্যাপক জনসচেতনতা- এই চারটি বিষয় একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে পারলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।

সরকার ইতোমধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। সেই লক্ষ্য অর্জনে ই-সিগারেটের মতো নতুন হুমকি মোকাবিলা করা অপরিহার্য। তরুণ সমাজকে রক্ষার স্বার্থে নিষিদ্ধ পণ্যের অবাধ বিক্রি বন্ধ করতে হবে এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

সময় থাকতে যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যতে ই-সিগারেট আসক্তির সমস্যা আরও ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে।

বিকেপি/এমএম 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর