Logo

আইন ও বিচার

প্রসঙ্গ

ঈদ উপলক্ষে কয়েদির সাজা মওকুফ

Icon

সোহানা ইয়াসমিন

প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪৫

ঈদ উপলক্ষে কয়েদির সাজা মওকুফ

বাংলাদেশ একটি মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে পরিচালিত দেশ। আমাদের সংবিধান মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করে। এ প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় উৎসব- বিশেষত পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা উপলক্ষে কারাগারে বন্দি কিছু কয়েদির সাজা মওকুফ বা হ্রাস করার যে প্রথা চালু রয়েছে, তা মানবিকতা ও সামাজিক পুনর্বাসনের এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তবে এই সাজা মওকুফ বা দণ্ড হ্রাসের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু বিধিবিধান ও নীতিমালা অনুসরণ করা হয়, যা অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয়। ফলে বিষয়টি নিয়ে সমাজে নানা প্রশ্নও দেখা দেয়।

দেশের কারাগার ব্যবস্থাপনায় বন্দিদের শাস্তি শুধু দণ্ডভোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাদের সংশোধন, পুনর্বাসন এবং সমাজে পুনরায় ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দর্শনের ভিত্তিতেই বিশেষ দিবস বা জাতীয় উৎসব উপলক্ষে বন্দিদের জন্য সাজা মওকুফ বা দণ্ড হ্রাসের সুযোগ রাখা হয়েছে।

দেশে বন্দিদের সাজা মওকুফ বা হ্রাসের ক্ষমতা মূলত রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৯ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি কোনো অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তির দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা রাখেন। তবে বাস্তবে এই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং কারা কর্তৃপক্ষের সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এছাড়া কারা বিধিমালা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে বন্দিরা দণ্ড হ্রাস বা বিশেষ রেমিশন পাওয়ার সুযোগ পান। বিশেষত ধর্মীয় উৎসব, জাতীয় দিবস অথবা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় উপলক্ষকে কেন্দ্র করে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

প্রতিবছর ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহা উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বন্দির সাজা মওকুফ বা হ্রাসের ঘোষণা দেওয়া হয়। এটি সাধারণত “বিশেষ রেমিশন” বা Special Remission নামে পরিচিত। এর ফলে নির্দিষ্ট কিছু বন্দির দণ্ডের মেয়াদ কয়েক মাস কমে যেতে পারে, কিংবা তারা নির্ধারিত সময়ের আগেই মুক্তি পেতে পারেন।

এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কারা কর্তৃপক্ষ প্রতিটি বন্দির আচরণ, অপরাধের ধরন, দণ্ডের মেয়াদ এবং সংশোধনের সম্ভাবনা বিবেচনা করে একটি তালিকা প্রস্তুত করে। পরে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়।

কোন বন্দিরা এই সুবিধা পেতে পারেন :

ঈদ উপলক্ষে সাজা মওকুফ বা দণ্ড হ্রাসের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বিবেচনা করা হয়- প্রথমত, বন্দির কারাগারে আচরণ ভালো হতে হবে। কারা কর্তৃপক্ষ বন্দির শৃঙ্খলা, নিয়ম মেনে চলা এবং সংশোধনের লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে। দ্বিতীয়ত, বন্দিকে সাধারণত দণ্ডের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভোগ করতে হয়। অর্থাৎ, কেউ যদি সদ্য কারাগারে প্রবেশ করে থাকে, তাহলে সে সাধারণত এই সুবিধা পায় না।

তৃতীয়ত, গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত অনেক বন্দি এই সুবিধার আওতার বাইরে থাকেন। যেমন সন্ত্রাসবাদ, রাষ্ট্রদ্রোহ, জঙ্গিবাদ, ধর্ষণ বা শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধে দণ্ডিতদের ক্ষেত্রে সরকার সাধারণত সতর্কতা অবলম্বন করে।

চতুর্থত, বিচারাধীন বন্দিরা সাধারণত সাজা মওকুফের সুবিধা পান না, কারণ তাদের অপরাধ এখনও আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।

ঈদ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। এই সময় পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করার প্রত্যাশা থাকে সবার। কিন্তু কারাগারে থাকা বন্দিদের জন্য এই আনন্দ অনেকটাই সীমাবদ্ধ। তাই ঈদের মতো উৎসবে কিছু বন্দিকে সাজা মওকুফ বা দণ্ড হ্রাসের সুযোগ দেওয়া হলে তা তাদের মানসিকভাবে নতুন করে জীবন শুরু করার অনুপ্রেরণা দেয়।

এছাড়া সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সংশোধনমূলক দণ্ডব্যবস্থায় বন্দিদের প্রতি মানবিক আচরণ তাদের পুনর্বাসনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। যখন একজন বন্দি উপলব্ধি করেন যে রাষ্ট্র তাকে দ্বিতীয় সুযোগ দিচ্ছে, তখন তার মধ্যে সংশোধনের আগ্রহ বাড়ে।

তবে এই বিষয়টি নিয়ে সমাজে ভিন্নমতও রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, গুরুতর অপরাধে দণ্ডিতদের ক্ষেত্রে সাজা মওকুফ বা হ্রাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি অবিচার হতে পারে। তাই সরকার সাধারণত এই বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাজা মওকুফের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি। যাতে করে জনগণের মধ্যে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা সন্দেহ সৃষ্টি না হয়।

দেশের কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। এই পরিস্থিতিতে সাজা মওকুফ বা দণ্ড হ্রাসের মতো উদ্যোগ কারাগারের ওপর চাপ কিছুটা কমাতেও সহায়তা করে। তবে এটি স্থায়ী সমাধান নয়।

কারাগার ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও মানবিক করতে হলে বন্দিদের জন্য শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। যাতে করে তারা মুক্তি পাওয়ার পর সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

ঈদ উপলক্ষে কয়েদিদের সাজা মওকুফের ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে একটি মানবিক উদ্যোগ। এটি বন্দিদের সংশোধনের সুযোগ দেয় এবং সমাজে পুনর্বাসনের পথ খুলে দেয়। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া নয়; বরং তাদের সংশোধন করে সমাজে ফিরিয়ে দেওয়াও একটি বড় দায়িত্ব। ঈদের মতো পবিত্র উৎসব সেই মানবিকতার বার্তাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু সংশোধনের সুযোগ তাকে নতুন করে বাঁচার আশা দেয়।

একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনের জন্য এই ধরনের উদ্যোগ আরও সুসংগঠিত ও নীতিনির্ভর হওয়া প্রয়োজন। তাহলেই ঈদের আনন্দ শুধু কারাগারের বাইরেই নয়, ভেতরেও মানবিক আশার আলো হয়ে পৌঁছে যাবে।

বিকেপি/এমএম 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর