Logo

আইন ও বিচার

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বনাম গণতন্ত্র

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬, ২০:০৩

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বনাম গণতন্ত্র

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো ক্ষমতার পৃথকীকরণ- বিধান, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ। এই তিনটি অঙ্গের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা না হলে রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা দুরূহ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নে যখন বিতর্ক তীব্র হয়, তখন তা সরাসরি গণতন্ত্রের কার্যকারিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রভাবিত করে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বলতে বোঝায় বিচারকগণ যেন কোনো প্রকার রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা বাহ্যিক চাপ ছাড়াই স্বাধীনভাবে আইন অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করতে পারেন। অন্যদিকে গণতন্ত্রের মূল চেতনা হলো জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন, যা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। যদি বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়, তবে কি তা নির্বাচিত সরকারের নীতিনির্ধারণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে? আবার, যদি নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগকে প্রভাবিত করে, তবে কি গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে পড়ে?

এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে রয়েছে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ বা পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণের নীতি। গণতন্ত্রে কোনো অঙ্গই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নয়। বিচার বিভাগ নির্বাহী ও আইন বিভাগের কার্যক্রমের বৈধতা পরীক্ষা করে, আবার বিচার বিভাগের নিজস্ব সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এই ভারসাম্য রক্ষাই একটি সুস্থ গণতন্ত্রের পরিচায়ক।

সংবিধানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- “রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ নিশ্চিত করা হবে।” যদিও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিচার বিভাগ প্রশাসনের অধীনস্থ থাকায় এর পূর্ণ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর মাধ্যমে নিম্ন আদালতগুলোকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করা হয়। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই পৃথকীকরণ কতটা কার্যকর হয়েছে? বিচারকদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির ক্ষেত্রে এখনো নির্বাহী বিভাগের প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জবাবদিহিতা। নির্বাচিত সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করে, কিন্তু বিচার বিভাগ সরাসরি জনগণের কাছে জবাবদিহি করে না। এই বাস্তবতা অনেক সময় বিচার বিভাগের সিদ্ধান্তকে ‘অগণতান্ত্রিক’ বলে সমালোচনা করার সুযোগ সৃষ্টি করে। তবে মনে রাখতে হবে, বিচার বিভাগের কাজ জনপ্রিয়তা অর্জন নয়, বরং আইনের শাসন নিশ্চিত করা।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে এই টানাপোড়েন লক্ষ্য করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে সুপ্রিম কোর্ট বহুবার সরকারের সিদ্ধান্তকে বাতিল করেছে, আবার ভারতের সুপ্রিম কোর্টও নানা সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। এসব ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা গণতন্ত্রকে দুর্বল না করে বরং শক্তিশালী করেছে। কারণ, এটি নিশ্চিত করেছে যে কোনো ক্ষমতাই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময়ে আদালতের রায় সরকারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে তা জনস্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে আদালতের সক্রিয়তা নিয়ে বিতর্কও সৃষ্টি হয়েছে। 

এখানে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের বিষয় রয়েছে। বিচার বিভাগ যদি অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করে, তবে তা ‘জুডিশিয়াল অ্যাক্টিভিজম’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। আবার বিচার বিভাগ যদি নীরব থাকে, তবে তা নির্বাহী বিভাগের স্বেচ্ছাচারিতাকে উৎসাহিত করতে পারে।

গণতন্ত্রের সুরক্ষায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অপরিহার্য। কারণ, এটি নাগরিক অধিকার রক্ষার শেষ আশ্রয়স্থল। যখন অন্য সব প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়, তখন মানুষ আদালতের দ্বারস্থ হয়। যদি আদালতও স্বাধীন না থাকে, তবে নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।

অন্যদিকে, গণতন্ত্রের নামে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক স্বার্থে বিচার ব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হলে জনগণের আস্থা নষ্ট হয়। এর ফলে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সমাজে অরাজকতা সৃষ্টি হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট নীতি ও সংস্কার। বিচারকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এছাড়া বিচার বিভাগের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে হবে।

গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারে। একই সঙ্গে বিচার বিভাগেরও উচিত নিজেদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

সবশেষে বলা যায়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র একে অপরের পরিপন্থী নয়, বরং পরিপূরক। একটি শক্তিশালী বিচার বিভাগ ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হতে পারে না। আবার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ছাড়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতাও অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাই সংঘাত নয়, সহাবস্থানের পথই হতে পারে এই সংকটের সমাধান।

রাষ্ট্রের সব অঙ্গের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই একটি কার্যকর, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা করে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করাই আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কোনো আপস নয়, প্রয়োজন সুদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর