গৃহকর্মী নির্যাতন
অদৃশ্য শ্রমের দৃশ্যমান সংকট
মাসুম আহম্মেদ
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০০:২৫
দেশের নগরজীবনে গৃহকর্মীরা এক অনিবার্য বাস্তবতা। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সচল রাখতে তাঁদের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু এই বিশাল শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ আজও আইনি সুরক্ষা, সামাজিক মর্যাদা ও মানবিক আচরণ থেকে বঞ্চিত। গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা প্রশ্নে আমাদের নীরবতা যেমন বিস্ময়কর, তেমনি উদ্বেগজনকও। এ যেন এক অদৃশ্য শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দৃশ্যমান সভ্যতা।
দেশে গৃহকর্মীদের বড় অংশই নারী ও শিশু। দরিদ্রতা, অশিক্ষা এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য তাদের শহরমুখী করে তোলে। কাজের সন্ধানে এসে তারা প্রায়ই অনিরাপদ পরিবেশে পড়ে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে লিখিত চুক্তি থাকে না, কাজের সময় নির্ধারিত নয়, মজুরি অনিয়মিত, আর নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে তার প্রতিকার পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে গৃহকর্মীরা হয়ে ওঠেন একপ্রকার ‘আইনবহির্ভূত শ্রমিক’।
গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা নতুন নয়। সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই শারীরিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, এমনকি মৃত্যুর খবরও প্রকাশিত হয়। এসব ঘটনার অনেকই থেকে যায় অপ্রকাশিত। কারণ ভুক্তভোগীরা সাধারণত দরিদ্র, প্রান্তিক এবং ক্ষমতাহীন। তাঁদের কণ্ঠস্বর শোনা যায় না, আর শুনলেও গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে অপরাধীরা থেকে যায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় ২০১৫ সালে “গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি” প্রণয়ন করা হয়। এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি। এই নীতিমালা আইনের মতো বাধ্যতামূলক নয়, ফলে এর প্রয়োগ নির্ভর করে সদিচ্ছার ওপর। বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ নিয়োগকর্তাই এই নীতিমালা সম্পর্কে অবগত নন কিংবা মানার প্রয়োজন মনে করেন না।
এখানেই মূল সংকট। গৃহকর্মীদের জন্য আলাদা আইন না থাকায় তাদের অধিকার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শ্রম আইনেও গৃহকর্মীরা অন্তর্ভুক্ত নন। ফলে তারা ন্যূনতম মজুরি, কর্মঘণ্টা, ছুটি কিংবা নিরাপদ কর্মপরিবেশের অধিকার থেকে বঞ্চিত। অথচ তারা যে শ্রম দেন, তা দেশের অর্থনীতিতে পরোক্ষভাবে বড় অবদান রাখে।
গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও বাধ্যতামূলক আইন। এই আইনে নিয়োগকর্তা ও কর্মীর মধ্যে লিখিত চুক্তি বাধ্যতামূলক করতে হবে। কাজের সময়, মজুরি, ছুটি, চিকিৎসা সুবিধা এবং নিরাপত্তা- সবকিছু স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত ও বিচারের জন্য দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
আইনের পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি। গৃহকর্মীদের আমরা অনেক সময় ‘কাজের মানুষ’ হিসেবে দেখি, কিন্তু ‘মানুষ’ হিসেবে দেখি না। এই মনোভাব পরিবর্তন না হলে কোনো আইনই কার্যকর হবে না। পরিবারে গৃহকর্মীদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদেরও যে অধিকার আছে, তা স্বীকার করতে হবে।
গৃহকর্মীদের একটি বড় অংশ শিশু। শিশু গৃহকর্মী নিয়োগ একটি বড় সামাজিক সমস্যা। শিশুরা স্কুলে যাওয়ার পরিবর্তে কাজ করতে বাধ্য হয়। এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। শিশু শ্রম বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং গৃহকর্মী হিসেবে শিশু নিয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।
এছাড়া গৃহকর্মীদের জন্য একটি নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এতে করে তাদের পরিচয়, ঠিকানা এবং কাজের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। কোনো সমস্যা হলে দ্রুত যোগাযোগ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নিয়োগকর্তাদেরও নিবন্ধনের আওতায় আনা উচিত।
গৃহকর্মীদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগও তৈরি করতে হবে। বর্তমানে তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারে না। শ্রমিক ইউনিয়নের মতো সংগঠন গড়ে উঠলে তারা নিজেদের দাবি তুলে ধরতে পারবে এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে।
সরকার, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যম- সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। গণমাধ্যমের দায়িত্ব হচ্ছে এই বিষয়গুলো তুলে ধরা এবং জনমত তৈরি করা। সুশীল সমাজ সচেতনতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। আর সরকারকে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ।
সবশেষে বলা যায়, গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু একটি মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় কর্তব্যও। একটি সভ্য সমাজে কোনো শ্রমিকই অবহেলিত থাকতে পারে না। গৃহকর্মীদের অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে আমাদের উন্নয়নও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
গৃহকর্মীদের আর ‘অদৃশ্য’ রাখা নয়; তাদের অধিকারকে দৃশ্যমান ও নিশ্চিত করলে আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনের পথে এগোতে পারব।
বাংলাদেশের খবর/এম এ

