Logo

আইন ও বিচার

দাম্পত্য জীবনে চুরির মামলা

Icon

বায়েজিদ তাশরীক

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০০:৩৭

দাম্পত্য জীবনে চুরির মামলা

দাম্পত্য জীবন পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সহমর্মিতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু বাস্তব জীবনে নানা কারণে সেই সম্পর্ক ভেঙে পড়তে পারে দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস, সম্পত্তিগত বিরোধ কিংবা পারিবারিক কলহের কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এই দূরত্ব যখন আইনি দ্বন্দ্বে রূপ নেয়, তখন অনেকেই প্রশ্ন করেন দাম্পত্য জীবন চলাকালে একজন কি অপরজনের বিরুদ্ধে “চুরির মামলা” করতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে আইন, সামাজিক বাস্তবতা এবং নৈতিকতার জটিল দিক।

প্রথমেই আইনি কাঠামোর দিকে নজর দেওয়া যাক। বাংলাদেশে চুরি সংক্রান্ত অপরাধ মূলত দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর আওতায় নিয়ন্ত্রিত। এই আইনের ৩৭৮ ধারায় চুরির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে- যদি কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে অন্যের সম্পত্তি তার সম্মতি ছাড়া সরিয়ে নেয়, তবে তা চুরি হিসেবে গণ্য হবে। এখানেই মূল প্রশ্নটি উঠে আসে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে “অন্যের সম্পত্তি” বলতে কী বোঝায়?

বাংলাদেশের পারিবারিক কাঠামোতে সাধারণত স্বামী-স্ত্রীর সম্পত্তি অনেক ক্ষেত্রে মিশ্র বা যৌথভাবে ব্যবহৃত হয়। যদিও আইনগতভাবে প্রত্যেকের সম্পত্তি আলাদা, কিন্তু সংসার জীবনে তা প্রায়ই পৃথকভাবে বিবেচিত হয় না। ফলে স্বামী যদি স্ত্রীর কোনো জিনিস ব্যবহার করেন, বা স্ত্রী যদি স্বামীর কোনো সম্পদ ব্যবহার করেন- তা সাধারণত চুরি হিসেবে গণ্য হয় না, কারণ এতে পারস্পরিক সম্মতির একটি ধারণা বিদ্যমান থাকে।

তবে এই সাধারণ ধারণা সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। যদি প্রমাণিত হয় যে, স্বামী বা স্ত্রী ইচ্ছাকৃতভাবে অপরজনের সম্পত্তি গোপনে আত্মসাৎ করেছেন এবং তার পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে তাহলে আইনের চোখে তা চুরির আওতায় পড়তে পারে। অর্থাৎ দাম্পত্য সম্পর্ক থাকলেই যে চুরির অভিযোগ অস্বীকার করা যাবে, এমন কোনো সরাসরি আইনি ছাড় নেই।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো “অসৎ উদ্দেশ্য” (ফরংযড়হবংঃ রহঃবহঃরড়হ)। চুরির মামলায় এটি প্রমাণ করা অত্যন্ত জরুরি। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যদি সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ থাকে, তাহলে অনেক সময় এক পক্ষ অপর পক্ষের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ আনতে পারেন। কিন্তু আদালত তখন খতিয়ে দেখবেন এটি সত্যিই চুরি, নাকি পারিবারিক বিরোধের একটি অংশ।

দেশের বিচারব্যবস্থায় সাধারণত দাম্পত্য বিরোধকে ফৌজদারি মামলার পরিবর্তে পারিবারিক বা দেওয়ানি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রবণতা বেশি। কারণ, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক একটি বিশেষ ধরনের আইনি সম্পর্ক, যেখানে পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্ব রয়েছে। তাই আদালত অনেক সময় চুরির মতো অভিযোগকে সরাসরি গ্রহণ না করে, বিষয়টি পারিবারিক বিরোধ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।

তবে কিছু ক্ষেত্রে চুরির মামলা গ্রহণযোগ্য হতে পারে। যেমন- স্ত্রীর ব্যক্তিগত গহনা, যা তার নিজস্ব সম্পত্তি (স্ত্রীধন) হিসেবে বিবেচিত, তা যদি স্বামী জোরপূর্বক নিয়ে নেন বা আত্মসাৎ করেন, তাহলে সেটি চুরির অভিযোগে পরিণত হতে পারে। একইভাবে স্বামীর ব্যক্তিগত সম্পত্তিও যদি স্ত্রী অসৎ উদ্দেশ্যে নিয়ে যান, তাহলেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

এখানে স্ত্রীধনের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে স্ত্রীধন একটি স্বীকৃত ধারণা, যা মূলত স্ত্রীর নিজস্ব সম্পত্তি যেমন বিয়ের সময় প্রাপ্ত গহনা, উপহার ইত্যাদি। এই সম্পত্তির ওপর স্ত্রীর পূর্ণ অধিকার রয়েছে, এবং স্বামী তা অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বা আত্মসাৎ করলে তা আইনি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তবে এসব মামলায় প্রমাণ সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা থাকে, সেখানে কে কখন কী নিয়েছেন বা ব্যবহার করেছেন তা নির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। ফলে চুরির মামলা অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল হয়ে পড়ে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আইনের অপব্যবহার। পারিবারিক বিরোধের জেরে অনেক সময় এক পক্ষ অপর পক্ষকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে চুরির মামলা দায়ের করেন। এটি শুধু আইনের অপব্যবহারই নয়, বরং বিচারব্যবস্থার ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করে। তাই এ ধরনের মামলা দায়েরের আগে সতর্ক হওয়া জরুরি।

দাম্পত্য জীবনে সমস্যা হলে তার সমাধান হওয়া উচিত পারস্পরিক আলোচনা, পারিবারিক মধ্যস্থতা বা প্রয়োজনে পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে। সরাসরি ফৌজদারি মামলা, বিশেষ করে চুরির মতো অভিযোগ, সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে এবং অনেক ক্ষেত্রে পুনর্মিলনের সম্ভাবনাও নষ্ট করে দেয়।

সচেতনতার দিক থেকেও এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই জানেন না যে, দাম্পত্য সম্পর্ক থাকলেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চুরির মামলা হতে পারে। আবার অনেকেই মনে করেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো কিছুই চুরি হিসেবে গণ্য হয় না, যা একটি ভুল ধারণা। এই বিভ্রান্তি দূর করা জরুরি।

গণমাধ্যম, আইনজীবী ও সচেতন নাগরিকদের উচিত এই বিষয়ে সঠিক তথ্য তুলে ধরা, যাতে মানুষ অযথা আইনি জটিলতায় না জড়ায়। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থারও দায়িত্ব রয়েছে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়ার পর তা যথাযথভাবে যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পারিবারিক সমাধানের দিকে উৎসাহিত করা। দাম্পত্য সম্পর্কে চুরির মামলা একটি সংবেদনশীল বিষয়। এটি শুধু আইনের প্রশ্ন নয়, বরং সম্পর্ক, বিশ্বাস ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গেও জড়িত। তাই এ ধরনের পরিস্থিতিতে আবেগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত না নিয়ে, আইনগত পরামর্শ নিয়ে এবং পরিস্থিতি বিবেচনা করে পদক্ষেপ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

দাম্পত্য জীবন টিকে থাকে বিশ্বাসের ওপর আর সেই বিশ্বাস ভেঙে গেলে আইনের আশ্রয় নেওয়া অনিবার্য হতে পারে।

বাংলাদেশের খবর/এম এ 

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন