হাদি হত্যা: অস্ত্র বিক্রেতা হেলাল ৩ দিনের রিমান্ডে
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:৪০
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রেতা মো. মাজেদুল হক হেলালকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম শুনানি শেষে রিমান্ডের আদেশ দেন। প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই রুকনুজ্জামান রিমান্ডের তথ্য নিশ্চিত করেন।
এদিন আসামিকে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো (পূর্ব) এর সহকারী পুলিশ সুপার আবদুর কাদির ভূঁঞা তাকে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।
আবেদনে বলা হয়েছে, হাদি হত্যার ঘটনায় ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র (পিস্তল) নরসিংদী এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নরসিংদী থানার অস্ত্র আইনে মামলা হয়। এই আগ্নেয়াস্ত্র এবং এ মামলার ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া কার্তুজ ও বুলেট, আগ্নেয়াস্ত্র ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ হয়, এই পিস্তল থেকেই ঘটনাস্থলে পাওয়া কার্তুজ ও বুলেট ফায়ার করা হয়েছে। তাছাড়া মাইক্রো এনালাইসিস পরীক্ষায় পিস্তলের সিরিয়াল নম্বরটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
তদন্তকালে জানা যায়, উদ্ধার করা পিস্তলটি ঢাকার এমএইচ আর্মস কোং আমদানি করে৷ পরবর্তীতে চকবাজারের ইসলাম উদ্দিন আহমেদ অ্যান্ড সন্সের নিকট ২০১৭ সালের ৩ ডিসেম্বর বিক্রয় করে। পরবর্তীতে ইসলাম উদ্দিন আহমেদ অ্যান্ড সন্স ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে চট্টগ্রামের হামিদুল হক আর্মস এন্ড কোং-এর কাছে বিক্রয় করে।
তদন্ত করে জানা যায়, এই দোকানের মালিক আসামি মাজেদুল হক হেলাল। এই লাইসেন্সটি পূর্বে তার বাবা হামিদুল হকের নামে ছিল। পরবর্তীতে ২০০০ সালে লাইসেন্সটি তার নামে করে নেয়। তার লাইসেন্সটি ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবায়নকৃত ছিল। পরে আর নবায়ন করেনি। লাইসেন্স নবায়ন না করেই ইসলাম উদ্দিন আহমেদ অ্যান্ড সন্স দোকান থেকে এই অস্ত্রটি ক্রয় করে নিয়ে যায়। এমতবস্থায় এই অস্ত্রটি মো. মাজেদুল হক হেলালের কাছ থেকে আসামিদের হাতে কীভাবে গেল সে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। আসামির নাম-ঠিকানা যাচাই-বাছাই চলছে। মামলার মূল রহস্য উদঘাটন, সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে পুলিশ হেফাজতে এনে নিবিড়ভাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে জন্য সাত দিনের রিমান্ডের প্রয়োজন।
রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর হারুন অর রশীদ রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘এটা একটা আলোচিত ঘটনা এবং মামলা। যার মৃত্যু নিয়ে বাংলাদেশে আজও আলোচনা, আন্দোলন চলমান। হামিদুল হক আর্মস অ্যান্ড কোং-এর মালিক এ আসামি। হাদি হত্যায় এ অস্ত্র কীভাবে ফয়সাল করিমের কাছে গেল তা জানার জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। সর্বোচ্চ রিমান্ড মঞ্জুরের প্রার্থনা করছি।’
হেলালের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। কিছু বলতে চান কি না আদালতের প্রশ্নে হেলাল বলেন, ‘না।’ পরে আদালত তার তিন দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।
এর আগে গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামের চকবাজার থানার হারেছ শাহ মাজার লেন থেকে চট্টগ্রাম পুলিশের সহায়তায় হেলালকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।
জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের জন্য বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে তিনি আক্রান্ত হন। চলন্ত রিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করেন চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী।
গুরুতর আহত হাদিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করার পর রাতেই তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর দুদিন পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদিকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ১৮ ডিসেম্বর হাদির মৃত্যুর খবর আসে।
শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটিতে হত্যার ৩০২ ধারা যুক্ত হয়। এরপর থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ডিবি পুলিশকে।
তদন্ত শেষে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে গত ৬ জানুয়ারি হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দেয় গোয়েন্দা পুলিশ।
অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন- প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭), তার বাবা মো. হুমায়ুন কবির (৭০), মা হাসি বেগম (৬০), স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা (২১), মো. কবির (৩৩), মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), ভারতে পালাতে সহায়তার অভিযোগ থাকা সিবিয়ন দিউ (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) ও হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র-গুলি উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার মো. ফয়সাল (২৫), মো. আলমগীর হোসেন ওরফে আলমগীর শেখ (২৬), সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী, ভারতে পালাতে সহায়তাকারী ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১) ও জেসমিন আক্তার (৪২)। তাদের মধ্যে ফয়সাল করিমসহ শেষের পাঁচজন পলাতক রয়েছেন।
অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ বলেছেন, আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং বিভিন্ন সময়ে হাদির দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে বোঝা গেছে, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই’ হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এছাড়া আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে ‘বাধাগ্রস্ত করতে’ এবং ভোটারদের মধ্যে ‘ভয়ভীতি তৈরি করতেই’ আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগীরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে হাদির নির্বাচনি প্রচারে অনুপ্রবেশ করে বলে অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়। কিন্তু অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট নয় ইনকিলাব মঞ্চ।
গত ১২ জানুয়ারি মামলাটি শুনানির জন্য ছিল। মামলার বাদী আবদুল্লাহ আল জাবের সেদিন অভিযোগপত্র পর্যালোচনার জন্য দুই দিন সময় চান। আদালত তা মঞ্জুর করে ১৫ জানুয়ারি অভিযোগপত্র গ্রহণের দিন ঠিক করেন।
ওইদিন ডিবি পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে নারাজি দাখিল করেছেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। পরে আদালত মামলাটি সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেন।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

