Logo

আইন ও বিচার

এমপি গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী রিমান্ডে

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:০৭

এমপি গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী রিমান্ডে

ছবি: সংগৃহীত

দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে করা মামলায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। একই মামলায় তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

মামলায় গ্রেপ্তার এই আসামিদের আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের সাত দিন করে রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেছিল পুলিশ। আবেদনটি করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামসুজ্জোহা সরকার।

শুনানিতে আসামিদের রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী রিমান্ডের বিরোধিতা করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত আদেশ দেন।

রিমান্ড শুনানিতে যা হলো: গাজী নজরুল ইসলাম ও প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমের রিমান্ড শুনানিতে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টানলেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি। তখন বিচারক তাকে থামিয়ে দিয়ে মামলার বিষয়ে বলতে বলেন।

পাঁচটি কারণ দেখিয়ে দুজনকে সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার এসআই শামসুজ্জোহা সরকার।

৩টা ১২ মিনিটের দিকে সিঁড়ি মাড়িয়ে তাদের পঞ্চম তলার এজলাসে তোলা হয়। এসময় তাদের হাতে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট ও বুকে বুলেট প্রুফ জ্যাকেট ছিল। আসামিদের কাঠগড়ায় নেওয়ার পর এসব খুলে দেওয়া হয়। বিচারক এহসানুল ইসলাম ৩টা ১৫ মিনিটে এজলাসে ওঠেন। ৩টা ১৬ মিনিটের দিকে মামলার শুনানি শুরু হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. শামসুজ্জোহা রিমান্ড আবেদনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। আসামিদের পক্ষে আইনজীবী মাহবুবুর রহমান রিমান্ড আবেদন বাতিল করে জামিনের আর্জি জানান। তিনি বলেন, দুই আসামির মধ্যে একজন রানিং এমপি, আরেকজন জামায়াতের কর্মী। আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা।

এসময় নজরুল ইসলাম আরেক আইনজীবীকে ডেকে বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধার কথা বলেনি।

আইনজীবী মাহবুবুর বলেন, নজরুল ইসলাম চারবারের এমপি। এ মামলায় তাদের রিমান্ডে নেওয়ার মতো বিন্দু বিসর্গ কিছু উপস্থাপন করতে পারেনি। তিনি একজন বয়স্ক মানুষ। রাষ্ট্রের একজন আইন কর্মকর্তা। আমরাও মৃত্যুর বিচার চাই। তবে তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের কোনো প্রয়োজন নেই। ন্যায়বিচারের স্বার্থে রিমান্ড আবেদন বাতিল করে তাদের জামিন দেওয়া হোক। আমরা সবকিছুতে সহযোগিতা করব। পালিয়ে যাওয়ার মতো লোক আমরা নই।

তিনি একজন আইনজীবীকে ডেকে বলেন, রোববার আমি আদালতে ছিলাম। রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ড আবেদনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, মামা ওবায়দুর রহমানকে প্রলোভন দেখিয়ে মরিয়মকে বিয়ে করেন এমপি নজরুল ইসলাম। প্রথম স্ত্রীকেও রাজি করান মরিয়মকে বিয়ে করাতে। ওই মেয়েকে নিয়ে বিভিন্ন হোটেল, মোটেলে যাওয়ার ভিডিও দেখা যায়। তারা ন্যাম ভবনে বাস করতেন। ২০ তারিখে মরিয়ম আত্মহত্যা করে। সুইসাইড নোটও পাওয়া যায়। তিনি বলেন, আত্মহত্যায় প্ররোচনা অভিযোগে মামলা হয়েছে। হত্যার বিষয় উড়িতে দিতে পারি না। সব কিছুতে পূর্ব পরিকল্পনা ছিল। আমরা শুনে এসেছি, জামায়াতে ইসলামীর লোক সৎ।

এসময় বিচারক তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, এ মামলার ঘটনায় থাকি। পলিটিকাল বিষয়ে না যাই।

পরে কৌঁসুলি ফারুকী বলেন, সৎ লোকের শাসন দেখছি। তাদের রিমান্ডের প্রার্থনা করছি। মাহবুবুর রহমান বলেন, তারা দুজনই বয়স্ক মানুষ। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। নজরুল ইসলাম একজন আইন প্রণয়ন কর্মকর্তা। ঘটনা একটা ঘটে গেছে।

উভয়পক্ষের শুনানি নিয়ে আদালত নজরুল ইসলামকে চার দিন এবং মাকছুদা ইসলামের একদিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।

চিরকুটে যা লিখে গেছেন মরিয়ম: মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের সময় বেশ কয়েকটি চিরকুট উদ্ধার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ কমিশনার ফজলুল করিম বলেন, মরিয়ম যে রুমে থাকতো, সে রুম থেকে তার লেখা কিছু চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। একটি চিরকুটে লেখা আছে, শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই...।

আরেকটিতে লেখা, আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবইবা কেমনে, যুদ্ধের শেষ প্রান্তে যেয়ে দেখি তুমিতো ছিলে বিপক্ষের সেনাপতি। আমি হেরেছি তুমি জিতেছো, কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো। আমি ধ্বংসের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও মুখে হাসি রেখেছি। ভেবে নাও এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।

আরেকটি চিরকুটে আছে দুটি লেখা। একটিতে আছে, সে ছিলো অন্য নারীর স্বামী। কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউ এর...!!! আর আমি ছিলাম বোকা...!!! অন্য কারো স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ...!!!

অপর লেখায় আছে, কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশি সম্মানের। কারণ ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয়—ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ!

আমি বাইরে মুখ দেখাব কীভাবে, বাবাকে বলেছিলেন মরিয়ম: সোমবার সকাল থেকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল মর্গে টিনএজ মেয়ের লাশের জন্য বসেছিলেন মাসুম বিল্লাহ দম্পতি। মেয়েকে সদ্য হারিয়ে বাবা কখনো কাঁদছিলেন, কখনো শান্ত ভঙ্গিতে কথা বলছিলেন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে।

মাসুম বিল্লাহ বলেন, আমি তো চাই সঠিক তদন্ত, আমি যেন ন্যায়বিচারটা পাই; প্রকৃত দোষী যেন শাস্তি পায়।

আপনার সঙ্গে শেষ কী কথা হয়েছিল, মেয়ে কোনো কষ্টের কথা বলেছিল কি না, জানতে চাইলে বাবা বললেন, আমার সাথে কথা কম হতো, তবে এমপির সঙ্গে সবসময় কথা হতো, পাশে থাকতো; কথা বলতে গেলে ও কথা বলতো না তো।

মাসুম বিল্লাহ বলেন, ও (মরিয়ম) বলতো যে, আমি বাইরে মুখ দেখাব কীভাবে। সে আমার মামা, আমার এত বড় ক্ষতি করবে আমি বুঝতে পারিনি। আমাকে মাফ করে দেন, আমি বাপের থেকে তাকে বেশি বিশ্বাস করতাম। বিশ্বাস করে আজকে আমি ওই পরিণতি ভোগ করতেছি। মেয়ে এই সব বলতো আর আমার পা জড়ায় কানতো। ওবায়দুলের কথা বলতো। ওরে খুব বিশ্বাস করে আজকে ওর এই পরিণতি। ওই ঘটনা না ঘটলে ওরে এমপি হোস্টেলে আইসা থাকা লাগে না, তাহলে এই ঘটনাও ঘটতো না।

জানতে চাইলে মুদি দোকানি মাসুম বিল্লাহ বলেন, সংসদ সদস্য গাজী নজরুল তার আপন খালু।

বাবার খালুর সঙ্গে কী করে মেয়ে সম্পর্কে জড়াল, এমন প্রশ্নে মাসুম বলেন, আমরা প্রথমে বুঝতে পারিনি। অনেক পরে জানতে পারছি। কিন্তু ওর মামার জন্য এভাবে সব শেষ হয়ে গেল।

ন্যাম ভবনের ওই ফ্ল্যাটে পুলিশ মরিয়মের হাতে লেখা চিরকুট বলে যে কাগজগুলো উদ্ধারের কথা জানিয়েছে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে মাসুম বলেন, এগুলো ওর লেখা কি না, সেটা আমি বলতে পারছি না। আমি ওর লেখা চিনি না।

যা বললেন সেই গাড়িচালক: গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তার মামা ওবায়দুর রহমান। তিনি একসময় গাজী নজরুল ইসলামের গাড়িচালক ও ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন।

লাশ উদ্ধারের পর একটি জাতীয় গণমাধ্যমকে ফোনে ওবায়দুর রহমান বলেন, মরিয়ম তার কাছে মেয়ের মতো ছিলেন। তার লেখাপড়ার খরচও তিনি বহন করতেন। এ ঘটনায় তিনি গভীরভাবে মর্মাহত বলেও জানান।

শেষ কয়েক দিনে মরিয়মের সঙ্গে কী ঘটেছিল, সামাজিক মাধ্যমে ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন কিনা কিংবা পারিবারিক কোনো বিরোধ ছিল কিনা এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওবায়দুর রহমান বলেন, ওই ঘটনার পর তিনি তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখেননি।

তবে তিনি দাবি করেন, মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের বিয়ে জোর করে হয়েছিল। গাজী নজরুলের কিছু কর্মকাণ্ড মেনে নিতে পারেননি বলেও জানান তিনি।

রোববার সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের বিপরীত পাশের ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর রাতে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে হেফাজতে নেয় পুলিশ।

রাতেই আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তার স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম ও নিহতের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ।

এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে এদিন দুপুরে শেরেবাংলা নগর থানা থেকে দুই আসামিকে আদালতে নেওয়া হয়।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন