
মানুষের জীবন আসলে এক দীর্ঘ নদীর মতো কখনো তার স্রোত তীব্র, কখনো আবার শান্ত ও স্তব্ধ। এই নদী যখনই নতুন বাঁক নেয়, তখনই তার প্রবাহকে সামান্য পিছিয়ে আসতে হয়। তেমনি মানুষের জীবনেও মাঝে মাঝে পিছিয়ে আসার প্রয়োজন হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে পিছিয়ে যাওয়া মানেই পিছিয়ে পড়া নয়। যেমন ধনুকের তীর ছুটে যায় বহু দূরে, কিন্তু তার সূচনা হয় পেছনের দিকে টেনে নেওয়ার মাধ্যমে। তাই এটাই অনেক সময় নতুন করে শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ, নতুন পথচলার আহ্বান।
সমুদ্রের ঢেউকে দেখলেই বোঝা যায় এ সত্য। ঢেউ প্রথমে সরে যায় পেছনে, কিন্তু সেই সরে যাওয়া তাকে দুর্বল করে না; বরং তার ভেতরে জমা হয় নতুন শক্তি। তারপর সে গর্জন তুলে আছড়ে পড়ে তটে। জীবনের পিছিয়ে আসাটাও তেমনি তা দুর্বলতা নয়, বরং তা ভবিষ্যতের বিজয়ের প্রস্তুতি।
জীবনের অন্তরে সবসময়ই এক অগ্নিদাহ জ্বলে থাকে, এক গোপন অগ্নিশিখা। অপূর্ণ স্বপ্নের দহন, অপ্রাপ্তির ব্যথা কিংবা সাফল্যের অপরিমেয় তৃষ্ণা। এই আগুনই মানুষকে জাগিয়ে রাখে, এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু এই আগুনকে সর্বদা প্রকাশ্যে দেখানো জরুরি নয়। পাহাড়ের গর্ভে যেমন আগ্নেয়গিরি নীরবে তার আগুন ধারণ করে, তেমনি মানুষের ভেতরের দহনও নিভৃতে লালন করতে হয়। কারণ দহন যদি কেবল ধ্বংস ডেকে আনে, তবে তা ছাই হয়ে নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিন্তু যদি সেই দহনকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে তা আলোকিত করবে পথ, দেবে নতুন প্রেরণা।
আমরা প্রায়ই নিজেদের প্রকৃত মূল্যায়ন করি না। অন্যের চোখে নিজেদের প্রতিফলন দেখতে গিয়ে নিজেদের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলি। অথচ সত্য হলো মানুষ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সে নিজেকে নিজের চোখে মূল্যবান করে তোলে। অন্য কারও স্বীকৃতি যতই আসুক না কেন, যদি ভেতরে আত্মবিশ্বাস জাগ্রত না হয়, তবে কোনো অর্জনই স্থায়ী হয় না। ধরা যাক, কেউ চাকরি পেয়েছে, তার মানে যোগ্যতা স্বীকৃত হয়েছে। অর্থাৎ সমাজ আর্থিক মানদণ্ডে মূল্যায়ন করেছে বলেই সে এই অবস্থানে এসেছে। কিন্তু এখানেই আমরা ভুল করি। ভাবি, এইটুকুই শেষ। আসলে চাকরি কোনো গন্তব্য নয়; এটি কেবল একটি সিঁড়ি মাত্র, যার ওপরে রয়েছে অসংখ্য ধাপ, অসংখ্য সম্ভাবনা। আমাদের দরকার সেই সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাওয়া। নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলা।
সময় এক অদৃশ্য নদী। তার স্রোত থেমে থাকে না। যে মানুষ থেমে যায়, সময় তাকে ফেলে রেখে যায় অনেক দূরে। তাই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাই প্রকৃত প্রজ্ঞা। কখনো কখনো স্রোত থেকে সরে এসে শক্তি সঞ্চয় করতে হয়, পিছিয়ে আসতে হয়। কিন্তু সেই পিছিয়ে আসার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের অগ্রযাত্রা।
অতএব, পিছিয়ে যাওয়া মানে পরাজয় নয়। বরং তা হলো পুনর্জাগরণের ঘোষণা। যতদিন মানুষের অন্তরে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বেঁচে থাকে, ততদিন তার ভেতরের আলো নিভে যেতে পারে না। অন্তরের দহনকে ছাইয়ে পরিণত না করে, তাকে আলোকশক্তিতে রূপান্তরিত করাই মানুষের আসল সাধনা।
শেষ পর্যন্ত মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায় তার আত্মবিশ্বাস। আর যে মানুষ নিজের ভেতরের আলো চিনতে পারে, নিজের শক্তিকে বিশ্বাস করতে শেখে। তার পক্ষে কোনো বাধাই অতিক্রম অযোগ্য থাকে না।