জীবন ও মৃত্যু চিরন্তন বিষয়। মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই দুইয়ের মধ্যবর্তী সময়টিকে বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু আধুনিক সভ্যতায় এই বোঝার সুযোগ ক্রমশ কমছে। প্রযুক্তি, করপোরেট জীবন, সামাজিক প্রতিযোগিতা এবং ভোগবাদ আমাদের জীবনকে দ্রুত, ব্যস্ত এবং ফলপ্রসূ করার চাপে ফেলে। আমরা জীবনের অর্থ খুঁজে পাই না। মৃত্যুর প্রকৃত মুখোমুখি থাকা থেকে আমরা দৃষ্টি সরাই। এই বাস্তবতায় বাংলা সাহিত্যের কীর্তিমান কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফার ‘মরণ বিলাস’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি শুধু সাহিত্যের ভাষা নয়, একটি সমাজতাত্ত্বিক দর্পণ।
এটি আমাদের দেখায়, বর্তমানে আমরা কীভাবে জীবন ও মৃত্যু, সম্পর্ক ও দায়বদ্ধতা, নৈতিকতা ও মানবিকতা নিয়ে বিপর্যস্ত। এ সময়ে আহমদ ছফার ‘মরণ বিলাস’ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ আমাদের সমাজে জীবনকে পরিমাপ করা হয় সাফল্য, উৎপাদনক্ষমতা এবং ভোগের মাধ্যমে। মানুষকে বিচার করা হয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে। আধুনিক শহুরে জীবনব্যবস্থা মানুষকে ক্রমাগত প্রতিযোগিতার মধ্যে রাখে। কারও থামার সুযোগ নেই। এই বাস্তবতায় মৃত্যু একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা হয়ে ওঠে। আমরা এটি আড়াল করি। আলোচনা এড়িয়ে যাই। ‘মরণ বিলাস’ ঠিক এই অস্বস্তিকর জায়গায় দাঁড়িয়ে মানুষের সামনে জীবনের শেষ সত্যকে উন্মোচিত করে।
আমরা এখন এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে প্রযুক্তি এবং চিকিৎসা মানুষকে অমরত্বের ভ্রম দেয়। দীর্ঘায়ু, উন্নত চিকিৎসা, কৃত্রিম সুখ—সবই আমাদের মৃত্যুভয়কে চাপা দেয়। করপোরেট জীবন মানুষকে শেখায় কীভাবে এগোতে হয়, শেখায়নি কীভাবে থামতে হয়। শেখায়নি মৃত্যুর সত্যকে স্বীকার করতে। ‘মরণ বিলাস’ সেই শিক্ষা দেয়। তাই এটি ক্রমে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে ভাবার পথকে প্রসারিত করে, নিয়ে যায় দূর থেকে বহুদূরে…
এই সময়ের মধ্যবিত্ত জীবনে হাসপাতাল এক পরিচিত স্থান। আইসিইউ, মেডিকেল রিপোর্ট, দীর্ঘ চিকিৎসা—সবই দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা। মানুষ মৃত্যুকে দূরের ঘটনা ভাবতে শেখেছে। অন্যের অভিজ্ঞতা মনে রাখে। কিন্তু আহমদ ছফার উপন্যাস সেই বাস্তবতাকে ব্যক্তিগত করে তোলে। এখানে মানুষ শেষ মুহূর্তে একা। আধুনিক সভ্যতা সেই একাকিত্বকে চাকচিক্য দিয়ে ঢাকতে পারে না।
সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের শেখায় সুখ প্রদর্শন করতে। সেখানে হাসি আছে, অর্জনের তালিকা আছে। কিন্তু সেখানে মৃত্যু খুবই আড়ালে। আমার মতো খুঁড়ে খুঁড়ে চলা মানুষের উপস্থিতি নেই। ভাঙা হৃদয় আছে, ভাঙা মানুষ নেই। কিন্তু সে সব সোশ্যাল মিডিয়া-সুন্দরীর শরীর স্পর্শ করতে দিই না। তাই বলা যায়, এখানে জীবনের চরম সত্য নেই। ‘মরণ বিলাস’ সেই ভাঙা বাস্তবতাকে প্রকাশ করে। কবি আল হাফিজ সম্ভবত এভাবেই বলেছিলেন—
‘এখানে পাখি শিকার করা নিষেধ,
চলুন মানুষ শিকার করি।’
এটাই আজকের মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমরা মৃত্যুকে জানি, কিন্তু স্বীকার করি না। আহমদ ছফা মৃত্যুকে সামনে এনে বসান। পালানোর সুযোগ দেন না। চোখ ফেরানোর জায়গা রাখেন না।
উপন্যাসটি সমাজতাত্ত্বিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যবিত্ত সমাজে ধর্ম আছে, কিন্তু মানবিকতা কমে গেছে। আচার আছে, দায়বদ্ধতা কমে গেছে। সম্পর্ক আছে, কিন্তু সত্যিকারের সহমর্মিতা নেই। পরিবারে অভিভাবকরা সন্তানকে পড়াশোনা ও সাফল্যের দাপটে মূল্যায়ন করে। দুশ্চিন্তাকে বোঝে না, একাকিত্বকে বোঝে না। ‘মরণ বিলাস’-এ মরণাপন্ন মানুষের চারপাশের মানুষের নিস্পৃহতা এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। এখানে কেউ সত্যিকারের পাশে থাকে না। সবাই নিজের সুবিধা দেখে।
করপোরেট সংস্কৃতি মানুষকে প্রতিযোগিতা শেখায়। জয় শেখায়। এগিয়ে যাওয়ার নেশা তৈরি করে। কিন্তু হার শেখায় না। মৃত্যু মানে চূড়ান্ত হার। ‘মরণ বিলাস’ সেই হারকে স্বীকার করার ভাষা দেয়। এই ভাষা আজ প্রায় অনুপস্থিত। আমরা হারতে জানি না, তাই ভেঙে পড়ি।
আজকের মানুষ দীর্ঘায়ুর স্বপ্ন দেখে। প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের মাধ্যমে অমরত্বের ভ্রমে আত্মতৃপ্তি খুঁজে পায়। কিন্তু অর্থপূর্ণ জীবন নিয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে যায়। ‘মরণ বিলাস’ সেই প্রশ্নকে সামনে আনে। জীবন কতদিন চলল, তা নয়; জীবন কতটা সত্য ও নৈতিক ছিল, সেটাই মুখ্য। উপন্যাসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবন শুধু অর্জন বা ভোগের হিসাব নয়। জীবন মানে সম্পর্ক, দায়বদ্ধতা এবং মানুষের মূল অস্তিত্বের স্বীকৃতি।
সমাজ যখন মানুষকে শুধুই কার্যকর ইউনিট হিসেবে দেখায়, তখন ‘মরণ বিলাস’ এক দার্শনিক দর্পণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি আমাদের শেখায়, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনের অসারতাকে মেনে নেওয়ার সাহসই প্রকৃত মুক্তি। এটি সমকালীন সমাজের জন্য সমাজতাত্ত্বিক প্রতিবিম্বও বহন করে।
আমরা একটি সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি, যেখানে অর্জনই প্রধান মাপকাঠি। ব্যক্তি যেন শুধুই সাফল্য বা উপযোগিতার মাধ্যমে বিচার্য। আর সামাজিক বন্ধন, নৈতিক দায়িত্ব, সহানুভূতি— এসব মূল্যহীন হয়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘মরণ বিলাস’ আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তোলে— শেষ অবধি এই জীবন কি প্রকৃত অর্থ বহন করে? সমাজের কাঠামো মানুষকে কতটা নিঃসঙ্গ বা ভাঙা অবস্থায় ফেলে? এই প্রশ্নগুলো শুধু সাহিত্যিক নয়, বরং বাস্তব সমাজের চ্যালেঞ্জ।
আহমদ ছফা আমাদের দেখান— মৃত্যু কোনো ব্যতিক্রম নয়। এটি প্রতিটি মানুষের জীবনের অঙ্গ। এটি সমাপ্তি নয়, বরং জীবনের সবচেয়ে নির্মম ও সৎ দর্পণ। আমাদের আধুনিক শহুরে জীবন, প্রযুক্তি এবং সামাজিক ভোগবাদ— সবকিছুই মৃত্যুর সামনে অর্থহীন হয়ে পড়ে। এই উপলব্ধিই ‘মরণ বিলাস’-কে আজকের সময়ের জন্য অপরিহার্য করে।
এই রচনার মাধ্যমে পাঠককে বাধ্য করা হয় নিজের ভেতরের অন্য সত্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। বোঝা যায়, জীবনের প্রকৃত মূল্য বেঁচে থাকা নয়। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অসারতা মেনে নেওয়ার সাহসিকতাতেই নিহিত প্রকৃত অর্থ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘মরণ বিলাস’ কেবল সাহিত্য নয়; এটি আমাদের সমাজের নৈতিক, সামাজিক ও মানসিক বাস্তবতার এক তীক্ষ্ণ প্রতিবিম্ব।
শেষে কবি সৈয়দ আহসান কবীরের কবিতা পড়তে পড়তে সময়কে আরও প্রাসঙ্গিক করতে খুবই ইচ্ছে করছে—
‘সুখাদ্যে রুচি নেই,
আমি এখন আগুন খাবো…।’
বিকেপি/এমএইচএস

